রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রাম। শীতের ভোরে হালকা আলো ছড়িয়ে পড়তেই মাঠের কুয়াশা মিলিয়ে যায়। সেই আলোয় চোখে পড়ে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের পৈতৃক বাড়ি। নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে দাঁড়ানো তাঁর জন্মঘর এখনো অতীতের সাক্ষী হয়ে আছে। মঙ্গলবার এই ঘরটি বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করছে।


\r\n

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর এখানে জন্ম নেন বেগম রোকেয়া। তখনকার সমাজে মেয়েদের শিক্ষার পথ ছিল প্রায় বন্ধ। নানা বাধা, নিষেধ আর রক্ষণশীলতার মধ্যে থেকেও তিনি নিজের পথ খুঁজে নিয়েছিলেন। ভাই ইব্রাহীমের সহায়তায় রাতের নরম আলোয় অক্ষর শেখার মধ্যেই খুলে যায় তাঁর কল্পনার দুনিয়া। পরে তিনি লিখেছিলেন ‘সুলতানার স্বপ্ন’, যেখানে উঠে আসে নারী স্বাধীনতার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।


\r\n

পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি কলেজের অধ্যক্ষ আবু আল বাকের বলেন, রোকেয়া এই গ্রামের মানুষের কাছে শুধু ইতিহাস নন, বরং এক ধরনের স্বপ্ন। তাঁর ভাষায়, এই গ্রামে দাঁড়ালে মনে হয়, এক শতাব্দীরও বেশি আগে জন্ম নেওয়া একজন নারী কীভাবে এত দূর ভাবতে পেরেছিলেন। আজও পায়রাবন্দ বদলাতে চায়, আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে আছেন রোকেয়া।


\r\n

স্থানীয়দের কাছে এই গ্রাম শুধু একটি জন্মস্থান নয়। এটি সমতা, শিক্ষা ও মানবতার প্রতীক। এখানে দাঁড়িয়েই রোকেয়া শিখিয়েছিলেন, নারীর অবস্থান বদলানো ছাড়া সমাজ বদলানো সম্ভব নয়। তাই গবেষক, শিক্ষাবিদ ও নারীনেত্রীরা চান পায়রাবন্দকে নারী ক্ষমতায়নের মডেল গ্রাম ঘোষণা করা হোক।


\r\n

কিন্তু দুঃখের বিষয়, রোকেয়ার এই জন্মভিটা দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, যে নারী এখান থেকেই নারী মুক্তির পথ দেখিয়েছেন, তাঁর জন্মস্থান আজও অরক্ষিত ও অনাদৃত।


\r\n

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মারা যান রোকেয়া। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। পরে কয়েক দফা তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি ওঠে। ২০১০ সালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তা কাগজে-কলমেই থেমে থাকে।


\r\n

রোকেয়া অনুরাগীদের দাবি, তাঁর পরিবার ও পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচিহ্ন এখনো পায়রাবন্দে আছে। কিন্তু রোকেয়া নিজে পড়ে আছেন কলকাতায়। এ নিয়ে কেউ কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না।


\r\n

তবে আশার কথা হচ্ছে, এবার তাঁর আঁতুড়ঘর বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে গেলে রক্ষণাবেক্ষণ ও গবেষণার নতুন পথ খুলবে। পর্যটক ও গবেষকরা এখানে এসে রোকেয়াকে আরও কাছ থেকে জানার সুযোগ পাবেন।


\r\n

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী জানান, রোকেয়া দিবসে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘর হস্তান্তর করবে। এ নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইতোমধ্যেই চুক্তির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

\r\n

রোকেয়া দিবস উপলক্ষে রংপুর জেলা প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় দিনভর নানা আয়োজন করছে। থাকবে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর চার দিনব্যাপী রোকেয়া মেলা।