ভারতের বিতর্কিত শিল্পগ্রুপ আদানিকে পতিত শেখ হাসিনা সরকারের দেওয়া ৯০০ একর জমি নিয়ে বিপাকে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই জমি এমন এক স্থানে অবস্থিত, যার সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তার স্বার্থ জড়িত। চট্টগ্রামের মিরসরাই এলাকায় অবস্থিত বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযোগকারী এ জমিটি চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় যাতায়াতের জন্য ‘চিকেন নেক’ হিসেবে পরিচিতি।

এ জমির বিষয়ে চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশ আট মাস আগে চিঠি দিলেও ভারত এখনো পর্যন্ত কোনো জবাব দেয়নি। ঢাকা এ চিঠির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। ইতঃপূর্বে এ জায়গায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য একটি স্থাপনা (নেভাল বেস) করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্র জানিয়েছে, ২০১৫ সালের ৬ জুন নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকালে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার প্রস্তাব পেশ করে ভারত। শেখ হাসিনা তাতে সম্মতি দিলে ওই বৈঠকেই যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। পরবর্তীতে হাসিনা বাগেরহাটের মোংলায় বা রামপালের আশপাশে ১০০ একর জমি দেওয়ার প্রস্তাব করেন। ভারত এতে আপত্তি জানালে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকার মোংলার পরিবর্তে রামপালে ৩০০ একর জমি দেয়।

বেজার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ভারত প্রথমে রামপালের ৩০০ একর জমি বুঝে নিলেও পরবর্তীতে তারা বেঁকে বসে। শেখ হাসিনার সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী তারা রামপালের পরিবর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে এক হাজার ৫৫ একর জমি দাবি করে বসে।

দিল্লির বৈঠকে হাসিনার ‘ভূমি’ বিসর্জন

বেজা জানিয়েছে, ২০১৭ সালের ৭ থেকে ১০ এপ্রিল শেখ হাসিনা ভারতের বিশেষ আমন্ত্রণে দিল্লি সফর করেন। ওই সময় দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠকে মিরসরাইয়ে ভারতের আদানি গ্রুপকে এক হাজার ৫৫ একর জমি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বাংলাদেশ ১৫৫ একর কমিয়ে ৯০০ একর জমি দিতে সম্মতি দিয়ে আসে।

বেজার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এসইজেড) কার্যক্রম দ্রুত শুরুর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ৯০০ একর জমিতে আদানির জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে ২০১৯ সালের অক্টোবরে আদানি বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (আদানি পোর্টস অ্যান্ড এসইজেড) সঙ্গে বেজা একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। ২০২২ সালের এপ্রিলে তারা এ উদ্দেশ্যে একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার (জেভি) গড়ে তোলার শর্তে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে ভারতীয় এলওসির আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ৬৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ ভারত থেকে ক্রয় করতে হবে।

এর আগে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি ওই প্রকল্পের জন্য ৮৪৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে। এ প্রকল্পের জন্য ভারত তাদের লাইন অব ক্রেডিট বা এলওসির অধীনে ১১৫ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তার অনুমোদন দেয়।

উন্নয়নকাজে উপেক্ষিত বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান

বেজার একজন কর্মকর্তা জানান, ভারতকে দেওয়া ৯০০ একর জমির কোনো মূল্য নির্ধারণ করেনি বাংলাদেশ। এ ছাড়া এসব জমিতে আদানির জন্য স্থাপনা নির্মাণে সব ধরনের উন্নয়নকাজ ভারতীয় প্রতিষ্ঠান করবেÑএমন কথাও বলা রয়েছে চুক্তিতে। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ থাকবে।

তিনি আরো বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারতীয় এলওসির অধীনে বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিলাম প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার জন্য আমরা ভারতের এক্সিম ব্যাংক ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের ওইসব চিঠির কোনো জবাব দেয়নি।

এলাকাবাসীর ক্ষোভ

মিরসরাইয়ে যে এলাকাটিতে ৯০০ একর জমি আদানিকে দেওয়া হয়েছে, সেটির এক পাশে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ উপকূল। আরেক পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে। আদানির এ প্রকল্প থেকে ভারতের ত্রিপুরার দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার।

মিরসরাইয়ের বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে যুক্ত এমন কজনের সঙ্গে কথা বলে আমার দেশ। ভারতের এই প্রকল্পের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা জানান, যখন কোনো এলাকায় একটি মেগা প্রকল্প হয়, সেখানে এলাকাবাসীর জন্য কিছু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে এমনটি সবাই আশা করেন। কিন্তু এ প্রকল্পের ধারেকাছেও কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের প্রবেশ নিষিদ্ধ, কাজ তো দূরের কথা। শুনেছি, এখানে ইট, পাথর ও বালুসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই ভারত থেকে আনা হবে। এখানে শ্রমিক হিসেবে যারা কাজ করবে, তারাও ভারতের। এমন একটি প্রকল্প কীভাবে এ দেশে চলতে পারে?

এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সামরিক বিশ্লেষক মেজর (অব.) মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার হীনমানসিকতা থেকে শেখ হাসিনা ভারতকে এই বিপুল পরিমাণ জমি বিনামূল্যে দিয়েছেন। এখানে বাংলাদেশের কোনো স্বার্থ জড়িত নয়, পুরো প্রকল্পটিই ভারতের একতরফা স্বার্থে করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বঙ্গোপসাগর লাগোয়া যে জায়গাটিতে ৯০০ একর জমি আদানিকে দেওয়া হয়েছে, সেখানে ভারত কী কাজ করবে তা নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন করা কিংবা তদারকি করার সুযোগ রাখা হয়নি। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে হওয়ায় ভারত থেকে জাহাজে করে পণ্য এনে ফেনী নদীর ওপর স্থাপিত মৈত্রী সেতু দিয়ে সেভেন সিস্টার্সে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই কারণে মোদি ও হাসিনা মিলে ফেনী নদীর ওপর নির্মিত মৈত্রী সেতুও উদ্বোধন করেছেন। কাজেই এ প্রকল্পটি নিয়ে আমি ভীষণ শঙ্কিত। কারণ, এ প্রকল্প ঘিরে ভারত বঙ্গোপসাগরে একটি জেটিও স্থাপন করেছে তাদের পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য।

১৬০০ একর জমি অধিগ্রহণ

২০১৭ সালে ভারতকে ৯০০ একর জমি দেওয়ার চুক্তি করলেও ২০১৮ সালের পর এসে বেজা আরো ৭০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নয়া দালান’-এর চেয়ারম্যান মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, এলাকাবাসী শুরু থেকেই এ প্রকল্প নিয়ে বেশ চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। কারণ, চোখের সামনে দেশের বিশাল একটি অংশ অপর একটি দেশ বিনা পয়সায় ভোগদখল করবেÑসেটা তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাছাড়া এর সঙ্গে দেশের নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত।

তিনি আরো বলেন, প্রথমে বেজা ভারতের আদানির কথা বলে ৯০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। এখানে আদানির কার্যক্রম শুরুর পরপরই ২০১৮ সালে পাশের মগাদিয়া মৌজায় আরো ৭০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। এর পুরোটাই ছিল স্থানীয় কৃষকদের কৃষিজমি। ফলে এটি নিয়ে কৃষকরা ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করেন। এ বিক্ষোভ দমাতে আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং বেজার কর্মকর্তারা একটি বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে বেজার কর্মকর্তারা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফকে ভারতের প্রতি শেখ হাসিনার অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে বলেন, ৯০০ একর জমি দেওয়ার বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ভারতের সরকার এখানে আরো ৭০০ একর জমি চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও (হাসিনা) ভারতকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন আমাদের এ জমি অধিগ্রহণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ চায় বেজা

মিরসরাইয়ে ৯০০ একর জমিতে আদানির প্রকল্পকে চালিয়ে নেওয়া দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য উপযোগী নয় বলে মনে করছেন বেজার কর্মকর্তারা। তারা বলেন, এ ধরনের একটি প্রকল্প যে কোনো স্বাধীন দেশের জন্যই আত্মঘাতী। আমরা এটিকে চালিয়ে নিতে পারি না।

এ বিষয়ে বেজার বিনিয়োগ উন্নয়নবিষয়ক নির্বাহী সদস্য সালেহ আহমেদ বলেন, আমরা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছি। ইন্ডিয়ান লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ও প্রজেক্টের বাতিল চেয়েছি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। সিদ্ধান্ত পেলে এটি প্রকল্পের তালিকা থেকে বাদ দেব।

আদানির এ প্রকল্পটি বেজার পক্ষ থেকে দেখভালের দায়িত্ব পালন করেছেন এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, এ প্রকল্পটি নিয়ে প্রথম থেকেই বিতর্ক ছিল। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটির কার্যক্রম আর এগোয়নি।

তথ্য: আমার দেশ