মানসিক চাপ, হতাশা ও একাকীত্ব—এই ত্রিমাত্রিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই আশ্রয় নিচ্ছেন ধর্মীয় অনুশীলনের। ইসলামিক দোয়া শুধু একটি প্রার্থনা নয়, এটি আত্মিক নিরাময়ের একটি কার্যকর পন্থা বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মনোবিজ্ঞানী ড. সাইদা মোনাওয়ারা জানান, “দোয়া এক ধরনের মাইন্ডফুল মেডিটেশন। আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনের অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্কে কর্টিসল হরমোন কমিয়ে ডোপামিন ও সেরোটোনিন বাড়ায়, যা একাকীত্ব হ্রাসে ভূমিকা রাখে।”

২০২২ সালে Journal of Religion and Health-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে আসে, নিয়মিত প্রার্থনা বা ধ্যান করলে একাকীত্বের অনুভূতি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ইসলামিক দোয়ার বিশেষত্ব হলো—এটি মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মিক ভারসাম্য, উভয়কেই স্পর্শ করে।

ইসলামিক স্কলার মুফতি তাকি উসমানী বলেন, “একাকীত্ব মানে আল্লাহ থেকে দূরত্বের অনুভূতি। আর দোয়া সেই দূরত্ব ঘোচানোর সেতু।” তিনি সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, আল্লাহ বলেন—\"আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিই\"।

খুলনার গৃহবধূ সায়মা আক্তার তার স্বামীর মৃত্যুর পর যে মানসিক বিপর্যয়ে পড়েছিলেন, তা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পান প্রতিদিন সূরা ইনশিরাহ পাঠ করে। “আমি বুঝতে পেরেছি, আমি একা নই—আল্লাহ সব সময় আমার সঙ্গেই আছেন,” বলেন তিনি।

একাকীত্ব দূর করতে ইসলামিক স্কলার ও থেরাপিস্টরা যেসব দোয়া পাঠের পরামর্শ দেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

সূরা দুহা: দুঃখ ও অসহায়ত্বে শান্তি দেয়

দোয়া ইউনুস: বিপদে মুক্তির উপায়

হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল: ভরসা ও নিরাপত্তার দোয়া

ঘুমের আগের দোয়া: মানসিক প্রশান্তির জন্য

দুঃখ ও দুশ্চিন্তার দোয়া: আবু দাউদের হাদিস অনুযায়ী কার্যকর

দোয়া কবুল হওয়ার জন্য ইসলামিক স্কলাররা কিছু শর্তের কথাও বলেন: হালাল রুজি, অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস, ধৈর্য ও গুনাহ থেকে বিরত থাকা।

ইসলামিক থেরাপি এবং সাইকোলজির সমন্বয় একাকীত্ব দূর করতে কার্যকর একটি পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাইকিয়াট্রিস্ট ড. মোহিত কামালের মতে, “যারা দোয়ার পাশাপাশি কাউন্সেলিং বা থেরাপি গ্রহণ করেন, তাদের সুস্থতার হার অনেক বেশি।”

একাকীত্বে হারাম পথ এড়িয়ে জীবনকে আলোকিত করতে ইসলামিক উপদেশের মধ্যে রয়েছে—নামাজে সময় বাড়ানো, কোরআন তাফসির শেখা, পরিবারকে সময় দেওয়া, এতিম-গরিবদের সাহায্য করা।

ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-র ভাষায়, “যে আল্লাহকে চিনলো, সে কখনো একাকী থাকলো না।” তাই একাকীত্ব শুধু একটি মানসিক অবস্থা নয়, বরং এটা আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার একটি ইশারা।

এই দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে দৈনন্দিন জীবনকে গঠনমূলকভাবে সাজাতে পারলে একাকীত্ব কেবল কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়, বরং তা একটি আত্মিক উন্নয়নের দ্বার খুলে দিতে পারে।