দেশে-বিদেশে স্বাস্থ্যসচেতনদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘হলুদের দুধ’ বা ‘গোল্ডেন মিল্ক’। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় বহু পুরনো এই পানীয় এখন যোগ ব্যায়াম, ফিটনেস ও ওয়েলনেস সংস্কৃতির অংশ হিসেবে আবারও আলোচনায়। গবেষকরা বলছেন-নিয়মিত হলুদের দুধ প্রদাহ কমাতে, ঘুম ভালো করতে, হজমশক্তি বাড়াতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করতে সহায়ক।

সাদিয়া ইসলামের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে-এক কাপ দুধে সামান্য হলুদ মিশিয়েই পাওয়া যায় এমন সব উপকার, যা আমরা সাধারণত অবহেলা করি। আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও এর প্রভাবের পক্ষে মত দিচ্ছে।

কারকিউমিন-হলুদের ‘ম্যাজিক কম্পাউন্ড’ :

হলুদের প্রধান উপাদান কারকিউমিন প্রদাহসৃষ্টিকারী COX-2, LOX ও iNOS এনজাইম দমন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ব্যথা, ফোলা, আর্থ্রাইটিস ও দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত সমস্যায় কার্যকর সহায়তা দেয়।
এছাড়া শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হওয়ায় এটি হৃদরোগসহ বেশ কিছু ক্রনিক রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে।

শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর সহজ উপায় :

অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণের কারণে হলুদের দুধ ঠান্ডা-কাশি প্রতিরোধে বহুদিন ধরেই ঘরোয়া চিকিৎসার অংশ। অনেক চিকিৎসকই মৌসুমি সংক্রমণের সময় এক চা-চামচ হলুদ দিয়ে গরম দুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

হৃদস্বাস্থ্য থেকে মস্তিষ্ক-বহুমুখী উপকারিতা :

হৃদস্বাস্থ্য: কারকিউমিন রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করে, রক্তনালির ক্ষতিকর পরিবর্তন ঠেকায়।

মস্তিষ্কের সুরক্ষা: আলঝেইমারের সঙ্গে সম্পর্কিত অ্যামাইলয়েড প্ল্যাক কমাতে সহায়তা করে বলে ধারণা রয়েছে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: গ্লুকোজ মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে কারকিউমিন সহায়ক; চিনি ছাড়া হলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও নিরাপদ।

মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব: BDNF বাড়িয়ে সেরোটোনিন-ডোপামিন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ফলে বিষণ্নতা কমাতে ভূমিকা রাখে।

ত্বক, চোখ ও হাড়-সৌন্দর্য ও সুস্থতায় অতিরিক্ত লাভ

হলুদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চোখের সুস্থতা রক্ষা করে, বার্ধক্যজনিত সমস্যা কমাতে ভূমিকা রাখে। একইসঙ্গে ত্বকের প্রদাহ, ব্রণ, একজিমা ও সোরিয়াসিসে উপকার পেতে নিয়মিত হলুদের দুধ অনেকেই ব্যবহার করছেন।
জয়েন্টের ব্যথা ও আর্থ্রাইটিসে কারকিউমিনের প্রভাব ভালো হওয়ায় বয়স্কদের মধ্যেও এর ব্যবহার বাড়ছে।

দুধের সঙ্গে মিশে পুষ্টিগুণ দ্বিগুণ :

দুধে থাকা ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, পটাশিয়াম ও ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের সঙ্গে হলুদের উপাদান মিলিয়ে তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ পুষ্টিকর পানীয়। ঘুমানোর আগে এক কাপ গরম গোল্ডেন মিল্ক-অনেকে বলছেন, এটি দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে এবং শরীরে আরাম আনে।

যাদের সতর্ক থাকা জরুরি :

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কিছু সতর্কতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন-

অতিরিক্ত কারকিউমিন পেটে অস্বস্তি, বমিভাব বা ক্র্যাম্প সৃষ্টি করতে পারে।

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্টদের বাদাম বা সয়া দুধ দিয়ে তৈরি গোল্ডেন মিল্ক নেওয়া উচিত।

ভেজাল হলুদ পেটের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

যাদের খাদ্য অ্যালার্জি আছে, তাদের বাড়িতে তৈরি অ্যালার্জি-সেফ রেসিপিতে গোল্ডেন মিল্ক বানানো উচিত।

ঘরেই বানিয়ে নিন নিরাপদ ‘গোল্ডেন মিল্ক’ :

১ গ্লাস দুধে-
 ১ চা-চামচ হলুদ গুঁড়া
 ১ ইঞ্চি আদা (ঐচ্ছিক)
দারুচিনি/এলাচ/লবঙ্গ (স্বাদ বাড়াতে)

১০-১২ মিনিট ফুটিয়ে ছেঁকে নিন।
সবশেষে এক চিমটি কালো মরিচ-যা কারকিউমিন শরীরে শোষণ বাড়ায়।
ডায়াবেটিস না থাকলে অল্প গুড় যোগ করা যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ :

নিয়মিত জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তনেই সুস্থতা বাড়তে পারে-এমনটাই বলছেন পুষ্টিবিদরা। তাদের মতে, গোল্ডেন মিল্ক সম্পূরক নয়, একটি স্বাস্থ্যকর ‘অ্যাড-অন’। তবে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।