রাজধানীর বহুল আলোচিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা ঝুলছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এই বিপুল পরিমাণ ঋণের প্রায় সবই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সাংসদ আনোয়ার হোসেন খান দীর্ঘদিন ধরে পলাতক।


\r\n

হাসপাতালটির সঙ্গে মেডিকেল কলেজ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং আরও কয়েকটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পাওনা আদায়ে ব্যাংকগুলো এখন চরম দুর্ভাবনায়। জামানত রাখা সম্পত্তি নিলামে তোলা হলেও ক্রেতা মিলছে না। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জামানতকৃত সম্পত্তির মূল্য পাঁচশ কোটি টাকাও হবে না।


\r\n

ব্যাংকগুলোর হিসাব অনুযায়ী, আনোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণ এখন ৩ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকার বেশি। এক্সিম ব্যাংকের কাছে তার পাওনা ৯৫০ কোটি টাকারও বেশি, ইসলামী ব্যাংক প্রায় ৬০০ কোটি। এছাড়া যমুনা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, এবি ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকসহ আরও বহু ব্যাংক ও অন্তত এক ডজন এনবিএফআই থেকে তিনি ঋণ নিয়েছেন।


\r\n

তথ্যসূত্রে জানা গেছে, নিজের নাম ছাড়াও স্ত্রী, শ্যালক, শাশুড়ি এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নাম ব্যবহার করে বেনামি ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এই তহবিলের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হয়েছে। সেখানে তার স্ত্রী, কন্যা ও ঘনিষ্ঠ স্বজনরা থাকেন। দেশে তিনি বিপুল পরিমাণ জমি ও বাড়ির মালিক হয়েছেন, শুধু ধানমন্ডিতেই তার ২০টির বেশি বাড়ি রয়েছে বলে জানা যায়।


\r\n

এক সময় শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন আনোয়ার হোসেন। ঋণখেলাপি হওয়ায় তিনি সেখান থেকে বাদ পড়েছেন। এসবিএসি ব্যাংকেও তার এবং তার স্ত্রীর শেয়ার ছিল, যা পরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তার স্ত্রী এখনো তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


\r\n

যমুনা ব্যাংক সম্প্রতি ৩৪৮ কোটি টাকার ঋণ উদ্ধারে ধানমন্ডির একটি প্লট নিলামে তোলার ঘোষণা দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নিলামে জমিটি বিক্রি হলেও পাওনা টাকার সামান্য অংশই উদ্ধার সম্ভব হবে।

\r\n

হাসপাতালটির এক কর্মকর্তা জানান, স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা আয় হলেও এর মাত্র ১০ শতাংশকে পরিচালন মুনাফা ধরা যায়। বাস্তবে এই আয় দিয়ে এত বিশাল ঋণ শোধ করা অসম্ভব। প্রতিষ্ঠানটি এখন কষ্টেসৃষ্টে টিকে আছে, পরিচিত কয়েকজন চিকিৎসকের রোগী ছাড়া হাসপাতালে তেমন ভিড়ও নেই।

\r\n

ব্যবসায়ী নেতা এবং ল্যাবএইডের এমডি ডা. এ এম শামীম বলেন, স্বাস্থ্যসেবাখাতে এত বড় ঋণ নেওয়া কখনোই যৌক্তিক নয়। হাসপাতালের প্রাথমিক বিনিয়োগের তিন গুণের বেশি ঋণ নেওয়া ঠিক না। তিনি মনে করেন, ব্যবসা ও রাজনীতি একসঙ্গে করলে সুশাসন নষ্ট হয় এবং ব্যবসার ক্ষতি হয়।

\r\n

গত দুই দশকে স্বাস্থ্য খাতে আনোয়ার হোসেন খানের উত্থান ছিল অস্বাভাবিক। ২০০০ সালের শুরুর দিকে তিনি একটি ছোট ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা করতেন। পরে ২০০৫ সালে হাসপাতাল এবং ২০০৮ সালে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১০ সালের আগে নিজেকে বিএনপি সমর্থক বললেও পরে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিপুল ঋণ সংগ্রহ করেন। জানা যায়, তিনি ব্যাংকগুলোতে প্রভাব খাটাতে তৎকালীন ক্ষমতাবানদের নাম ব্যবহার করতেন এবং খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও তার ঋণ দীর্ঘদিন অক্ষত ছিল।

\r\n

ইসলামী ব্যাংকের এমডি মো. ওমর ফারুক জানান, আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি আত্মগোপনে আছেন। তাদের ব্যাংকেও কিছু জামানত আছে এবং প্রয়োজন হলে নিলাম করা হবে।

\r\n

হাসপাতালে গিয়েও তার অবস্থান বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি নাকি মাঝে মাঝে গভীর রাতে হাসপাতালে আসেন এবং এতে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়।

\r\n

হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা খুবই দুর্বল। কর্মকর্তারা বলছেন, হাসপাতালটি এখন খুব সীমিত আয়ে কোনোভাবে টিকে আছে।