জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন স্থগিত হলেও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বন্ধ হয়নি। বরং একের পর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক অবসর, বরখাস্ত ও বদলি—এর সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে এনবিআরের অভ্যন্তরে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক।
সরকার আগেই আশ্বাস দিয়েছিল, আন্দোলন প্রত্যাহারের পর আর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এমনকি এনবিআর চেয়ারম্যানও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাভাবিক কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে আন্দোলন স্থগিতের ঠিক পরেই বিভিন্ন পদক্ষেপে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে কর্মকর্তা মহলে।
২৯ জুন এনবিআরের আন্দোলন স্থগিত হওয়ার পরপরই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে (২৯ জুন থেকে ৩ জুলাই) ১৬ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সরকারের সিদ্ধান্তে তিন সদস্য ও এক কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। বরখাস্ত করা হয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারকে। এছাড়া বদলি করা হয় আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে।
দুদকের অভিযোগ, শুল্ক ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে এসব কর্মকর্তা ঘুষের বিনিময়ে কর ফাঁকিতে সহায়তা করেছেন। তবে এনবিআরের অভ্যন্তরে অনেকের দাবি, এসব ব্যবস্থা আচমকা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এনবিআরের এক উপকমিশনার বলেন, “বহিষ্কার, অপসারণ, দুদক অভিযান—সব মিলিয়ে প্রচণ্ড আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই ভাবছেন সরকারের কাছে ‘ক্ষমা’ চেয়ে কিছুটা নিরাপদ হওয়া যায় কি না।”
এক অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, “মাত্রই একটা ভূমিকম্প হলো। সেই আতঙ্ক কাটতে সময় লাগবে। যদি সামনের সপ্তাহে আর নতুন কোনো ব্যবস্থা না হয়, তাহলে হয়তো বলা যাবে যে সরকার একটু ইতিবাচক অবস্থানে এসেছে।”
জনপ্রশাসন বিশ্লেষক ও সাবেক আমলা ফিরোজ মিয়া বলেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এনবিআরের মতো একটি সংস্থা যখন এমন অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এসব সিদ্ধান্ত আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে। সরকারের উচিত ছিল আরও কৌশলী ও সংলাপনির্ভর পদক্ষেপ নেওয়া।”
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, “শাস্তিমূলক এসব সিদ্ধান্ত এনবিআরের নয়, সরকারের। আমরা কাউকে চাপ দিইনি, কিংবা নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নিইনি।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্দোলন প্রত্যাহার সত্ত্বেও যদি সরকার প্রতিশোধপরায়ণভাবে ব্যবস্থা নেয়, তবে ভবিষ্যতে প্রশাসনের সঙ্গে সরকারের আস্থার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগের নামে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে টার্গেট করা হলে সেটাও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
পরিস্থিতি এখন নজরদারির মধ্যে, কারণ এর পরবর্তী ধাপই নির্ধারণ করবে এনবিআরের ভবিষ্যৎ পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল কিংবা আরও অস্থির হয়ে উঠবে।





