দেখতে পিতলের তৈরি একটি সাধারণ সৌখিন কলম। দৈর্ঘ্য সাড়ে পাঁচ ইঞ্চির মতো। শার্ট-প্যান্ট বা পাঞ্জাবির পকেটে সহজেই রাখা যায়। ডায়েরি বা প্যাডের ভাঁজেও বহন করা সম্ভব। বাইরে থেকে দেখলে সন্দেহ করার কিছু নেই। কিন্তু ভেতরে কালি নয়, লুকিয়ে আছে নিঃশব্দ মৃত্যু। কলমের মতো দেখতে এই বস্তুটি আসলে একটি সক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র।
পিতলের ক্যাপ ও স্টিলের বডির এই অস্ত্রটির ভেতরে রয়েছে বিশেষভাবে তৈরি ব্যারেল ও ফায়ারিং পিন। স্প্রিং মেকানিজমে এটি পিস্তলের মতো কাজ করে। ব্যবহার করা হয় ৭ দশমিক ৬৫ কেএফ ব্র্যান্ডের একটি বুলেট। একবারে একটি গুলি ছোড়া যায় এবং গুলির সময় কোনো শব্দ হয় না। কলমের পিন চাপলেই নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে প্রাণঘাতী বুলেট। কলমের আদলে তৈরি হওয়ায় অস্ত্রটির নাম ‘পেনগান’।
পেনগান ব্যবহার করাও সহজ। কলমের মতো মাঝখান থেকে খুলে ওপরের অংশে বুলেট লোড করতে হয়। এরপর স্প্রিংযুক্ত লিভার টেনে ছেড়ে দিলে ফায়ারিং পিন আঘাত করে বুলেটের পেছনে, সঙ্গে সঙ্গে গুলি বেরিয়ে আসে।
নাটক বা সিনেমায় এমন অস্ত্রের দৃশ্য দেখা গেলেও বাস্তবে এর ভয়ংকর ব্যবহার ধরা পড়ে খুলনায়। গত বছর জেলার ফুলতলা উপজেলায় খুন হন ঘের ব্যবসায়ী সুমন মোল্লা। ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রথম সামনে আসে পেনগানের তথ্য। পরে অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী স্থানীয় একটি ধানক্ষেত থেকে অস্ত্রটি জব্দ করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, পেনগানটি ভারতে তৈরি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছরের ২২ এপ্রিল জামিরা বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে পিপরাইল দাসপাড়া কালভার্টের কাছে সুমন মোল্লার পথরোধ করে সন্ত্রাসীরা। তদন্তে জানা যায়, ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সুমনের মুখে পেনগান ঢুকিয়ে লিভার চাপা হয়। গুলিতে তাঁর মুখ ও গলার অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
পরদিন সুমনের বাবা রকিবুদ্দিন গাজী ফুলতলা থানায় মামলা করেন। মামলায় নয়জনের নাম উল্লেখসহ আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। ঘটনার দশ দিন পর যশোর থেকে প্রধান আসামি মোমিদ গাজীকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সে পেনগানের তথ্য দেয়।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ফুলতলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, মামলার দুই আসামি কারাগারে রয়েছে এবং তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অস্ত্রটি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের অস্ত্র বাংলাদেশে তৈরি হয় না। তবে ভারতে পেনগানের ব্যবহার আগে থেকেই দেখা গেছে। সুমন মোল্লা হত্যা মামলায় জব্দ হওয়া অস্ত্রটি ভারত থেকে এসেছে বলে তারা নিশ্চিত।
খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল হক বলেন, মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পেনগানটির ব্যালিস্টিক রিপোর্ট শিগগিরই পাওয়া যাবে। এরপর অস্ত্রটি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেনগানের মতো গোপন ও অচেনা প্রাণঘাতী অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে আসা জননিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কলমসদৃশ এই অস্ত্র টার্গেট কিলিং ও কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ে ব্যবহার করা হয়। এগুলো ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গভীর তদন্ত জরুরি।
সুত্র : এশিয়া পোষ্ট





