ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা নিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৪৩ জন, আহত হয়েছেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে শনিবার আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিতর্কিত সহায়তা কর্মসূচি ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ (জিএইচএফ) ঘিরেই এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, জিএইচএফ পরিচালিত খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় ইসরায়েলি সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ৭৪৩ ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৮৯১ জন।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি হানি মাহমুদ জানান, এটি কেবল প্রাথমিক হিসাব। বাস্তবে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তিনি বলেন, “মানুষ যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাদ্যের জন্য এগিয়ে আসে, তখনই ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালায়। মা-বাবারা নিজেরা না খেয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বহু পরিবার প্রতিদিন অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।”
২০২৪ সালের মে মাসের শেষ দিকে চালু হওয়া ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ শুরু থেকেই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। বিভিন্ন সূত্র বলছে, প্রকল্পের নিরাপত্তাকর্মী এবং ইসরায়েলি সেনারা সহায়তা নিতে আসা সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে।
বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, প্রকল্পে নিযুক্ত কয়েকজন মার্কিন ঠিকাদার নিজের চোখে দেখেছেন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা “অস্ত্র হাতে অত্যন্ত খামখেয়ালি আচরণ করছেন।”
সমালোচনার মুখে জিএইচএফ কর্তৃপক্ষ বলেছে, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, “আমরা প্রতিটি সহায়তা কেন্দ্রের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করি।”
যুক্তরাষ্ট্রও জিএইচএফ-এর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেন, “গাজায় কার্যকরভাবে খাদ্য পৌঁছে দিতে সক্ষম একমাত্র সংস্থা হলো জিএইচএফ।” গত জুনের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রকল্পটিতে ৩০ মিলিয়ন ডলারের সরাসরি অনুদান দেয়।
তবে একই সময় সহিংসতা আরও বাড়তে থাকে। শনিবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে জিএইচএফ-এর এক বিতরণ কেন্দ্রে গ্রেনেড হামলায় আহত হন দুই মার্কিন কর্মী। বর্তমানে তারা স্থিতিশীল অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
ব্রিটেনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জিএইচএফ প্রকল্পকে বর্ণনা করেছে “অমানবিক, প্রাণঘাতী ও সামরিকীকৃত একটি উদ্যোগ” হিসেবে। সংস্থাটির ভাষ্য, “এই প্রকল্প আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রশমনের মুখোশ মাত্র, যার আড়ালে ইসরায়েলি সেনাদের হাতে গণহত্যা অব্যাহত রয়েছে।”.
অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ত্রাণ সংস্থাও এই সহায়তা প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সহায়তা কেন্দ্রগুলো এমনভাবে সামরিকীকরণ করা হয়েছে, যেখানে গাদাগাদি করা মানুষের ওপর প্রতিদিনই গুলি চালানো হচ্ছে। ফলে খাদ্য, পানি ও ওষুধের ঘাটতিতে জর্জরিত ফিলিস্তিনিরা একদিকে যেমন সহায়তা নিতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে প্রাণ হারানোর ঝুঁকিও নিচ্ছে।
গাজার বাসিন্দা মাজিদ আবু লাবান জানান, “আমার সন্তানরা টানা তিন দিন না খেয়ে ছিল। তাদের জন্য খাবার আনতেই জিএইচএফ-এর সহায়তা কেন্দ্রে যেতে হয়েছিল। রাতের আঁধারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেটসারিম করিডোর ধরে রওনা হই।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষের ভিড় বাড়তে থাকলে ইসরায়েলি সেনারা আমাদের ওপর গোলা ছুড়তে শুরু করে। সবাই তখন জীবন বাঁচাতে ছুটে পালায়।”





