রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো গঠিত হয়নি কোনো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (কেএসএস)। অথচ ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ফি’র নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৪৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪০০ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে, যার কোনো হিসাব বা স্বচ্ছতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নেতৃত্ব বিকাশের পথ রুদ্ধ করতে ‘লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি’ বন্ধের অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন থেকে সরে আছে কর্তৃপক্ষ। এতে গণতান্ত্রিক চর্চার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক সচেতনতা ও নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করছেন অনেকে।


এই প্রেক্ষাপটে ছাত্র সংসদ আইন বাস্তবায়ন ও নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি দল গত রবিবার থেকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে আমরণ অনশন শুরু করেছেন। গতকাল পর্যন্ত পাঁচজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যাদের মধ্যে দু’জনকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে শিক্ষার্থী প্রতি বছরে ২০০ টাকা করে ছাত্র সংসদ ফি নেওয়া হলেও ২০০৯ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদ গঠনের বিষয়ে কোনো ধারা রাখা হয়নি। তা সত্ত্বেও ২০০৮ সাল থেকে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত প্রায় ৩৯ লাখ টাকার বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়, যা ‘জেনারেল ফান্ডে’ সংরক্ষণ করে প্রশাসন নিজেদের মতো করে ব্যয় করেছে বলে অভিযোগ।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক দুটি শিক্ষাবর্ষে (২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫) শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা একটি স্বতন্ত্র অ্যাকাউন্টে রাখা হয়েছে।


বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং চলতি বছরের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। ইউজিসি ‘ছাত্র সংসদ সংবিধান’ চূড়ান্ত করার জন্য একটি সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ইউজিসির এক সদস্য। এখন অপেক্ষা শুধু রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের।


অনশনে থাকা শিক্ষার্থীরা বলছেন, “১৭ বছরেও ছাত্র সংসদ হয়নি, অথচ আমাদের কাছ থেকে কোটি টাকার মতো তোলা হয়েছে। সেই টাকার কোনো হিসাব নেই। এটা পরিকল্পিত লুটপাট।” তারা দাবি করছেন, অবিলম্বে ছাত্র সংসদ আইন পাস ও নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে, না হলে অনশন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

এক শিক্ষার্থী বলেন, “ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার। অথচ সেটা প্রতিষ্ঠা না করে প্রশাসন বরং এই নামে অর্থ আত্মসাৎ করেছে।”


বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানান, তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা মেনে নিয়েছেন এবং ইতোমধ্যেই আইন প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। তার ভাষায়, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরই খসড়া আইন সিন্ডিকেটে পাস করে ইউজিসিতে পাঠিয়েছি। এখন কমিশনে ভেটিংয়ের অপেক্ষায়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে তা আইনে পরিণত হবে। আশা করছি, অক্টোবরের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে।”

তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, এত দীর্ঘ সময়েও আইন পাস না হওয়া এবং নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশ না করাকে গড়িমসি ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করছেন তারা।

এদিকে, অনশনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ক্রমাগত শারীরিক অবনতি নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও সহপাঠীরা উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে আরও বড় আন্দোলনে যাওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।