কাদেরের অভিযোগ \"বক্তব্য লিখে দেয়া রায়হানই এখন 'শিবির', আগে ছিলেন ছাত্রলীগের কর্মী\" — রায়হানের জবাব, \"কাদের আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করতে পারে না, তাই নোংরামিতে নেমেছে\"


জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি নিজেই যাঁর কাছ থেকে বক্তব্য ও প্রেস রিলিজ লিখে নিতেন, সেই রায়হান উদ্দিনকে এখন \"ছাত্রলীগ\" পরিচয় দিয়ে কালিমালিপ্ত করছেন। রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী।


সম্প্রতি কাদের নিজের ফেসবুকে লেখেন,

\"এফ রহমান হলের ১৮-১৯ সেশনের রায়হান উদ্দিন, যিনি ছাত্রলীগের এক্টিভ কর্মী ছিলেন। মেধাবী হওয়ায় হল ক্যান্ডিডেটদের বক্তব্য লিখে দিতেন, সারাক্ষণ পাশে থাকতেন। রিয়াজ নামের কুখ্যাত ছাত্রলীগ সভাপতির অনুসারী ছিলেন। অথচ এখন তাকেই দেখা যাচ্ছে শিবিরের বড় নেতা হিসেবে! আগের ফেসবুক আইডি ফেলে নতুন আইডি চালালেও পুরনো কীর্তি মুছতে পারেনি।\"


এই পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় রায়হান উদ্দিন নিজের ফেসবুকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলেন, \"কাদের মিথ্যাচার করেছে। আমি সাধারণত এসব নোংরামিতে যাই না, তবে চুপ থাকলে অনেকে ভাববে ওর কথাই সত্য। কাদেররা আদর্শিকভাবে আমাকে মোকাবিলা করতে পারে না, সে কারণেই এখন চরিত্র হননের চেষ্টা করছে।\"


রায়হান আরো দাবি করেন, \"কাদেরের আন্দোলনের সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, এমনকি ৯ দফার ইংরেজি অনুবাদ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাঠানো প্রায় সব প্রেস রিলিজ আমার লেখা। ২৪ জুলাইয়ের পর থেকে তার সব প্রেস রিলিজেই আমার সম্পৃক্ততা ছিল।\"


তিনি বলেন, \"কাদের ঠিকই জানে যে এসব আমি লিখেছি। অথচ এখন গোপন করে আমাকে 'ছাত্রলীগ' ট্যাগ দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। সাদিক ভাইয়ের মেসেজে কাদেরের অনুরোধে আমি বক্তব্য লিখে দিয়েছি — স্ক্রিনশটসহ প্রমাণ রয়েছে।\"


রায়হান স্মরণ করেন, \"২০২২ সালের ১ আগস্ট, মুজিববিরোধী বক্তব্যের অভিযোগে এবং গেস্টরুমে না যাওয়ায় ছাত্রলীগের রিয়াজের নির্দেশে আমাকে সারারাত মানসিক নির্যাতন করে হল থেকে বের করে দেয়। এই ট্রমা আমি আজও ভুলতে পারিনি। আর তখন কাদেরের সহযোদ্ধারা হলের ছাত্রলীগের পদে বসে ছিলেন।\"


তিনি আরও জানান, \"আমি বক্তৃতা ভালো দিতাম বলে রিয়াজ আমাকে পরামর্শ চাইতো — সেটা অপরাধ? বহুজনকে তো আমি পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু লিখে দিয়েছি — এটা যদি প্রমাণ করতে পারে, আমি জুতার মালা গলায় দেবো।\"


নিজের ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা নিয়ে রায়হান বলেন, \"২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগের পোস্ট করেছি, কারণ আইডি বেহাত হয়েছিল। প্রোগ্রাম ও গেস্টরুমে যেতেও হতো — শুধু আমি না, সবারই যেতেই হতো। এরপর আমি ধীরে ধীরে এসব থেকে সরে যাই, যার ফলে আমাকে আবারও হল থেকে বের করে দেয়া হয়।\"


তিনি বলেন, \"ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি হবার জন্য ছাত্রলীগের পদ নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আমি নিইনি। বরং ছাত্রলীগ আমার সভাপতি পদ ছিনিয়ে নেয়ার জন্য বারবার চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমাকে কার্যত অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।\"


রায়হান গেস্টরুম প্রসঙ্গে বলেন, \"আমি কাউকে অশ্রদ্ধা করলে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চেয়েছি। তবে কখনোই কারও অধিকার হরণ করিনি। আমি গেস্টরুমে কেমন ছিলাম, সেটা জুনিয়ররাই জানে।\"


তিনি বলেন, \"আমি বারবার এইসব উল্লেখ করিনি, কারণ হাজার শহীদ ও আহতদের অবদানের কাছে এই অভিজ্ঞতাগুলো তুচ্ছ। কিন্তু কাদেররা যখন নোংরামিতে নামে, তখন এসব বলা জরুরি হয়ে পড়ে। কাদের যদি ভিপি হতে চায়, তাহলে এইসব ছোটলোকি বন্ধ করে আদর্শিক সাহস দেখাক।\"


অন্যদিকে, কাদের বলেন,

\"আমি রায়হানকে সরাসরি কখনো বক্তব্য লিখে দিতে বলিনি। আমি শিবির নেতা সাদিক কায়েমকে বলেছি, কে লিখে দিয়েছে জানি না।\" তবে ঢাবি শিবিরের সাবেক এক সভাপতি দাবি করেন, কাদের নিজেও একসময় শিবিরের জনশক্তি ছিলেন। এই বিষয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে কাদের বলেন, \"সেটা আলাপের বিষয়। দুই-একদিন কারো সঙ্গে ওঠাবসা করলেই সদস্য হওয়া যায় না।\"


রায়হান কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন যে, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে তিনি ‘ছাত্রলীগ’ ট্যাগ দিয়ে চরিত্র হননের চেষ্টা করছেন। আর কাদের বলছেন, তিনি রায়হানকে বক্তব্য লিখতে বলেননি, তবে রায়হানের অতীত সম্পর্ক নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। দু’পক্ষই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মুখে থাকলেও, আন্দোলনের ভেতরের জটিল অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক এখন প্রকাশ্যে।