বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি অতীতের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এমন একটি শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে ব্যক্তি বা দল নয়, রাষ্ট্রই প্রধান হবে। তিনি বলেন, অতীতের ভুল ও সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি একটি জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি গড়ে তুলতে চায়।

আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সোমবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান এসব কথা বলেন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় ভাষণটি সম্প্রচার করা হয়।

ভাষণে তিনি স্পষ্ট করেন, ভবিষ্যতে বিএনপি হবে এমন একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক দল, যা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনায় সমর্থন পেলে দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা কঠোর হওয়া যায়, বিএনপি সরকার ইনশাল্লাহ ততটাই কঠোর হবে। দেশে পুনরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। দেশবাসীর কাছে এটি আমার অঙ্গীকার।”

তারেক রহমান বলেন, গত ১৫–১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পর মূল কাজ হলো ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা। জনগণের রায়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

ভাষণে তিনি দেশবাসীকে কোনো উসকানিতে না পড়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সহযোগিতা করতে আহ্বান জানান। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ৫ আগস্টের আগে যে ধরনের অপশাসন বা সমস্যা ছিল, বিএনপি আর সেই অবস্থায় ফিরে যেতে চায় না এবং অতীতের সহিংসতার অধ্যায় পুনরাবৃত্তি হবে না। তিনি বলেন, শুধু সুন্দর বক্তৃতা দিয়ে হাততালি পাওয়া সহজ, কিন্তু দেশ চালানো কঠিন। তাই তিনি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ওপর জোর দেন।

তারেক রহমান ভাষণে চারটি মূল বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন—সংস্কার ও পরিবর্তন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার, এবং বেকারত্ব ও তরুণদের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের পর জনগণ আবার তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছে এবং সবাইকে ভোটাধিকারের সদ্ব্যবহার করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ভোটদানকে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন।

নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে দেশজুড়ে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে নাগরিক মূল্যায়ন এবং সকল ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তারেক রহমান বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি কোনো হঠাৎ সময়ে আসা সুযোগ নয়; এর জন্য বিএনপি ও গণতন্ত্রের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল এবং জনগণ দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করেছেন। এই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম, খুন ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। আয়নাঘর নামক এক বর্বর বন্দিখানায় মানুষদের ওপর দমন-নিপীড়ন চালানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ১,৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০,০০০। জন্মযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শহীদ ও আহতদের প্রতি তারেক রহমান গভীর সমবেদনা জানান।

এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিএনপি ইতোমধ্যেই নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। প্রতিটি সেক্টর ও শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা বিএনপির মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী, বেকার জনগোষ্ঠী এবং নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার।

তারেক রহমান বলেন, পর্যায়ক্রমিকভাবে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কয়েকটি সেক্টরকে চিহ্নিত করে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের সর্বত্র কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা, বিনামূল্যে স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে বেকার তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা হবে। এতে তারা দেশে ও বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরিতে যুক্ত হয়ে সরাসরি কর্মসংস্থানে অংশ নিতে পারবেন।