জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত লবণাক্ততা ও পরিবেশগত দূষণের প্রভাবে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার মিহরাব যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
দেশের ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও ধর্মীয় ইতিহাসে অনন্য পরিচিতি পাওয়া বাগেরহাট জেলা বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘মসজিদের শহর’ হিসেবে। ১৫শ শতকে সুফি সাধক উলুগ খানজাহান আলীর পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা এই নগরীর অন্যতম নিদর্শন ষাটগম্বুজ মসজিদ। মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীর এই অনন্য নিদর্শনটি বর্তমানে গুরুতর ক্ষয়ের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি, অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও শিল্প দূষণের কারণে মসজিদের দেয়াল, মিহরাব, স্তম্ভ ও গম্বুজে ফাটল, চুন খসে পড়া ও নকশা বিবর্ণতার মতো ক্ষয় দৃশ্যমান হচ্ছে। নিচ থেকে উঠে আসা লবণাক্ত পানি ইটের ভেতরে লবণ ক্রিস্টাল তৈরি করে কাঠামোগত বন্ধন দুর্বল করে দিচ্ছে।
সম্প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার ডিসিপ্লিন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি ও আইকমসের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বর্ষাকালের আর্দ্রতা ও লবণাক্ততার কারণে ষাটগম্বুজ মসজিদের ক্ষয় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. শফিকুল আলমের নেতৃত্বে কমিটি গত ১৭ এপ্রিল মসজিদ পরিদর্শন শেষে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ষাটগম্বুজ মসজিদের মিহরাব যে কোনো সময় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ড. মো. শফিকুল আলম বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার সময় সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস থেকে বায়ুবাহিত লবণাক্ত পানির প্রভাব মিহরাবের ওপর বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। বর্তমানে দেওয়ালের কয়েকটি অংশে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা দেখা যাচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, বেলে পাথরে নির্মিত মিহরাব ও স্তম্ভ নরম ও ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় লবণ ও আর্দ্রতায় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লোহার ক্ল্যাম্প ও ডাওয়েলে জং ধরায় সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে লোড বহনক্ষমতা কমে গেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, মিহরাব ধসে পড়লে ষাটগম্বুজ মসজিদকে ইউনেসকো ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ইন ডেঞ্জার’ তালিকাভুক্ত করতে পারে, যা দেশের মর্যাদার জন্য বড় আঘাত হবে। এ কারণে ইউনেসকোর সহায়তায় দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারকাজ শুরুর সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন জানান, ইউনেসকোর সহযোগিতায় মসজিদের প্রতিটি দেয়াল, গম্বুজ ও স্তম্ভের ক্ষয়মানচিত্র তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে ঢাকা ইউনেসকো অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক সংরক্ষণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে বুয়েটের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারদের সহায়তা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।





