নোবিপ্রবি প্রতিনিধি: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) সড়ক সংস্কার ও পরিবহন শেড নির্মাণের প্রায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকার দুটি প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে হুমকি, হেনস্তা ও মানসিক চাপ দিয়ে বিল আটকে দেওয়ার চেষ্টা এবং প্রকল্পের ম্যানেজারকে জিম্মি করে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত হিসেবে নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. জাহিদ হাসান, সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান ও সহসভাপতি আমিনুল ইসলামের নাম এসেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নোবিপ্রবিতে ২ কোটি ২৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ে আরসিসি রাস্তার ঢালাই এবং ১ কোটি ৪১ লাখ ৬১ হাজার ২ টাকা ব্যয়ে পরিবহন শেড নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। রাস্তার কাজটি করে কেএমসি ব্রিকস্ এবং পরিবহন শেড নির্মাণ করে মেসার্স মোজাম্মেল হক। উভয় প্রকল্পের ম্যানেজার ছিলেন স্থানীয় ঠিকাদার মো. ইমদাদুল করিম রুমেল। প্রকল্প দুটির দায়িত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. সৈয়দ আহমদ।
কাজ শেষের পর বিল উত্থাপনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সৈয়দ আহমদের ওপর চাপ ও হুমকি দেন বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগী প্রকৌশলী জানান, ৮ থেকে ১০ দিন আগে জাহিদ ও হাসিব অফিসে এসে বিল ফাইনাল না করার নির্দেশ দেন। বিষয়টি তিনি ট্রেজারারকে জানালে নিয়ম অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়।
এরপর গত ২৮ জানুয়ারি সকাল ১১টার দিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসিব ফোন করে বিল উত্থাপন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন। পরে সভাপতি জাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক হাসিব গ্রুপ কলে যুক্ত হয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগালি, তুই-তোকারি ও অশালীন আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেন প্রকৌশলী। তিনি জানান, জাহিদ তাকে ১২ তারিখের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে না দেওয়া এবং ঢুকলে পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেন। বিষয়টি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ, পরিকল্পনা দপ্তরের প্রধান, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক- কর্মকর্তা নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনকে অবহিত করেছেন।
এদিকে, এর আগেও একই দুই প্রকল্পের ম্যানেজার মো. ইমদাদুল করিম রুমেলকে জিম্মি করে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে। রুমেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৫ ডিসেম্বর প্রশাসনিক ভবন থেকে বিলসংক্রান্ত কাজ শেষে বের হলে একজন তাকে চলমান সংস্কারকাজের ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চায়। একপর্যায়ে তার কলার চেপে ধরে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ছাত্রদল নেতা আমিনুল এসে টাকা দিলে মীমাংসার প্রস্তাব দেন।
রুমেল আরও জানান, এরপর তাকে প্রশান্তি পার্কের একটি চা দোকানে নিয়ে গিয়ে দুই লাখ টাকা না দিলে প্রক্টর অফিস ও পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কয়েকজন ছাত্রদল কর্মী তাকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যায়। পরিচয় যাচাই শেষে প্রক্টর তাকে বসিয়ে রেখে বের হন। এ সময় আমিনুল আবার এসে সভাপতির সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে দাবি করে এক লাখ টাকা চান। শেষ পর্যন্ত প্রক্টর অফিসে মুচলেকা দিয়ে তিনি ছাড়া পান। এ সময় একজন নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ান বলেও অভিযোগ করেন রুমেল।
রুমেল বলেন, “জামানতসহ আমার প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা এখনো বকেয়া। চাঁদা না দেওয়ায় এই বিল আটকে দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লোকজনকেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে শুনছি।”
অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদলের সহসভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি কোনো চাঁদা দাবি করেননি। ছাত্রলীগের দোসর হওয়ায় রুমেলকে প্রক্টর অফিসে নেওয়া হয়েছিল দাবি করে তিনি বলেন, চাঁদার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান বলেন, তিনি ও নোবিপ্রবি ছাত্রদল এ ধরনের কোনো কার্যক্রমে জড়িত নন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বানোয়াট। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে চেনেন না এবং গ্রুপ কলে হুমকির অভিযোগও মিথ্যা বলে দাবি করেন।
ছাত্রদলের সভাপতি মো. জাহিদ হাসান বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। রাস্তা ও পরিবহন শেডের কাজ এবং বিল উত্থাপন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিষয়, ছাত্রদলের নয়। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের তিনি চেনেন না এবং চাঁদা দাবির প্রশ্নই আসে না।
প্রক্টর এ এফ এম আরিফুর রহমান জানান, কয়েকজন একটি ঠিকাদারকে তার অফিসে নিয়ে আসে এবং ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলে। নিরাপত্তার স্বার্থে ঠিকাদারের যাতায়াত সীমিত করতে বলা হয় এবং মুচলেকা নেওয়া হয়।
নোবিপ্রবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ (মুরাদ) বলেন, ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে খারাপ আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি জানালে তাকে নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। কাজ শেষ হলে আইন অনুযায়ী ঠিকাদার তার বিল ও জামানত পাবেন।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, নিয়ম মেনে কাজ সম্পন্ন হলে কোনো বিল আটকানো হয় না এবং কেউ তা আটকাতে পারবে না। প্রকৌশলীকে হুমকির বিষয়ে এখনো লিখিত অভিযোগ পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





