রাজশাহীর পুঠিয়া থানার এক নিভৃত পল্লী থেকে উঠে আসা ২১ বছরের তরুণ মুকিতু ইসলাম নিশাত আজ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অঙ্গনে বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল নাম। শৈশবের স্বপ্ন আর নিরলস পরিশ্রমের সমন্বয়ে তিনি অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ফেলোশিপ ২০২৬। সারা দেশের শীর্ষ প্রতিযোগীদের মধ্যে ১৩তম স্থান অধিকার করে তিনি নিজের মেধা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
নিশাতের প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ শুরু হয় অতি অল্প বয়সে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি প্রথম কম্পিউটারের সঙ্গে পরিচিত হন। যখন তার সমবয়সীরা খেলাধুলায় মগ্ন থাকত, তখন ছোট্ট নিশাত সময় কাটাতেন কম্পিউটার নিয়ে। প্রযুক্তির প্রতি সেই কৌতূহলই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় প্রোগ্রামিংয়ের জগতে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করেন। কোনো নামী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নয়, বরং নিজের প্রবল আগ্রহ এবং ইউটিউবের বিভিন্ন টিউটোরিয়াল দেখে ধীরে ধীরে নিজেকে দক্ষ করে তোলেন তিনি। তার এই পথচলা প্রমাণ করে, শেখার ইচ্ছা থাকলে সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
নিশাতের এই সাফল্যের পেছনে তার পরিবারের অবদানও অনস্বীকার্য। বাবা সবসময় স্বপ্ন দেখতেন তার ছেলে একদিন বিশ্বমঞ্চে নিজের মেধার পরিচয় দেবে। অন্যদিকে মা ছিলেন তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও কঠোর পথপ্রদর্শক। মায়ের নিয়মিত দিকনির্দেশনা এবং উৎসাহ নিশাতকে পড়াশোনা ও কোডিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। নিজের সাফল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিশাত বিনয়ের সঙ্গে বলেন, “আমার আজকের এই সাফল্যের প্রতিটি ধাপে রয়েছে সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত এবং আমার মায়ের চোখের পানির দোয়া।”
এই অনুপ্রেরণার শক্তিতেই তিনি আন্তর্জাতিক আউটরিচি ফেলোশিপ অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ওপেন সোর্স প্রকল্পে কাজ করছেন। প্রযুক্তির জগতে নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি এমন কিছু সফটওয়্যার তৈরি করেছেন, যা সমাজ ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নিশাতের তৈরি ট্যাক্স ও ভ্যাট ক্যালকুলেটর সফটওয়্যারটি ব্যবসায়ীদের জন্য জটিল কর হিসাব সহজ করে দেয় এবং কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি তিনি তৈরি করেছেন ফিশ ফার্ম ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, যা মাছ চাষিদের জন্য একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে পুকুরের তথ্য সংরক্ষণ, উৎপাদন পর্যবেক্ষণ এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভ-ক্ষতির হিসাব করা সম্ভব। এছাড়াও অনলাইন ব্যবসাকে সহজ ও আধুনিক করতে তিনি তৈরি করেছেন একটি পূর্ণাঙ্গ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম নেক্সট-বাজার (নেক্সটবাজার)।
বর্তমানে নিশাত নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-এর কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি আগামী ২০২৬ সালের গুগল সামার অব কোড-এ অংশ নেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন। তবে নিজের সাফল্যেই তিনি থেমে থাকতে চান না। ভবিষ্যতে দেশের তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে বিনামূল্যে প্রোগ্রামিং শেখানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
রাজশাহীর পুঠিয়ার একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই তরুণের স্বপ্নযাত্রা আজ আন্তর্জাতিক গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। তার এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার এক অনুপ্রেরণাময় গল্প। নিশাতের এই জয়যাত্রা দেশের লাখো তরুণকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাচ্ছে।





