আমি সত্যিই ভাবিনি যে আমাকে আবার জুলাই চার্টার আর গণভোট নিয়ে কথা বলতে হবে। কিন্তু, ঠিক সেটাই হচ্ছে। বিএনপির ইশতেহার দেখে;বিশেষ করে সাংবিধানিক সংশোধনী সংক্রান্ত অংশটি পড়ে আমি চরমভাবে হতাশ।
বিএনপি এখন একেবারে পরিষ্কার করে দিয়েছে যে দলটির কাছে পুরো সংস্কার এজেন্ডার ভিত্তি হলো ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত দলিল(ভিন্নমতসহ) এবং তাদের নিজস্ব ৩১ দফা। এর বাইরে আর কিছু নয়।
এতেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে।তাহলে গণভোটের ভবিষ্যৎ কী? আমরা আসলে কী করছি? চলুন দেখি-
ক. আমরা একটি গণভোট করছি এবং যদি তা পাস করে, তাহলে পরবর্তী সংসদ একটি দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা গণপরিষদ (constituent assembly) হিসেবে কাজ করবে।
খ. গণভোটে চারটি প্রশ্ন ছিল। এর মধ্যে প্রথম দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে।
দ্বিতীয়টি একটি উচ্চকক্ষ নিয়ে, যেখানে সদস্যরা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন।
আমার মতে, এই দুটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমি জানতাম যে প্রথম উপ-প্রশ্নটিতে একটি ফাঁক রয়েছে। সেখানে সাংবিধানিক পদে নিয়োগ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে বিষয়গুলো জুলাই চার্টার অনুযায়ী হবে। কিন্তু জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন আদেশে ‘জুলাই চার্টার’ বলতে ১৭ অক্টোবরের দলিলটিকেই বোঝানো হয়েছে, যেখানে ভিন্নমত অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমি আশা করেছিলাম বিএনপি এই ফাঁকটি ব্যবহার করবে না। আশা করেছিলাম আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব এবং একটি সমাধানে পৌঁছাব। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে দ্বিতীয় প্রশ্নে কোনো ফাঁক নেই। উচ্চকক্ষ ও PR সংক্রান্ত প্রশ্নে জুলাই চার্টারের কোনো উল্লেখ নেই। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-
একটি উচ্চকক্ষ থাকবে,
সেটি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবে,
এবং সাংবিধানিক সংশোধনীতে উচ্চকক্ষের ভূমিকা থাকবে।
এখন যখন বিএনপি বলছে যে তারা উচ্চকক্ষ করবে ঠিকই, কিন্তু সেখানে PR মানবে না (নোট: নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন PR নয়) এবং উচ্চকক্ষকে কোনো অর্থবহ ক্ষমতা দেবে না—তাহলে এর অর্থ হলো, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও তারা গণভোটের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। তাহলে এর মানে কী দাঁড়ায়?
এর মানে হলো-আপনি আপনার ইচ্ছা, আপনার মতামত প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নেব সেটি শুনব কি না। কোন মহাবিশ্বে একটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহার একটি গণভোটের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হতে পারে? আরেকদিকে আপনি মানুষকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে উৎসাহ দিচ্ছেন, কিন্তু সেই ‘হ্যাঁ’-র অর্থ আপনি নিজেই ব্যাখ্যা করবেন। এটি নিছক রাজনৈতিক কৌশল, গেমিং এবং চরম ভণ্ডামি।
আমি বুঝতে পারি না, এতে বিএনপির কী লাভ-এর বাইরে যে তারা নিজেদের এমন একটি অহংকারী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে যারা ভোটাররা কী চায় বা কী ভাবছে, তাতে কোনো গুরুত্ব দেয় না। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে, যখন লড়াই এখনো হাড্ডাহাড্ডি, তখন একটি দল কীভাবে উপকৃত হয় এই ঘোষণা দিয়ে যে-দেখুন, আপনারা ভোট দেন, কিন্তু আমরা আপনাদের চেয়ে ভালো জানি?
এটা মনে হয় বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী এবং মনে করছে যে নির্বাচনের আগে কিছু ভোট হারালেও তাতে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।
আরেকটি বিষয়;
যদি গণভোট পাস করে, তাহলে এই সংসদ হবে সীমিত সাংবিধানিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি গণপরিষদ। বিএনপি কি এতে একমত? যদি না হয়, তারা কি বোঝে যে যেকোনো কিছু করতে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে? আর যদি একমত হয়, তাহলে কি তারা বলতে পারে যে গণভোটের কিছু অংশ তারা মানবে, কিন্তু যেগুলো অপছন্দ করে সেগুলো মানবে না? এটা কীভাবে সম্ভব?
সবশেষে বলি,বিএনপি যদি সত্যিই তাদের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অর্থাৎ এমন একটি উচ্চকক্ষ যার কোনো কার্যকর ক্ষমতা নেই, তাহলে তারা কোনো প্রহরী (watchdog) তৈরি করছে না; তারা কেবল একটি অনুগত পোষা প্রাণী (lapdog) তৈরি করছে। এটি অর্থের অপচয় এবং এমন একটি নাগরিক সমাজকে আরও রাজনীতিকরণ করবে, যে সমাজ ইতোমধ্যেই তাদের নতুন ‘প্রভু’ খুঁজে বেড়াচ্ছে।





