দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় তারকা রাশমিকা মান্দানা ও বিজয় দেবরাকোন্ডা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ভারতের ঐতিহাসিক শহর উদয়পুরের একটি বিলাসবহুল হেরিটেজ হোটেলে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক আয়োজনে তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। রাজকীয় পরিবেশ, ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান এবং তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে বিয়ের আয়োজন ছিল স্বপ্নময়।


বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ভোরে তেলেগু রীতিতে। প্রথমে গণেশপূজা ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে মঙ্গলাচরণ করা হয়। এরপর অগ্নিকে সাক্ষী রেখে ‘সপ্তপদী’ সম্পন্ন হয়, যেখানে সাতটি প্রতীকী পদক্ষেপের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের সাতটি অঙ্গীকার সম্পাদন করা হয়। এ সময় পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে বর–কনে অগ্নি প্রদক্ষিণ করেন। মালাবদল, কন্যাদান ও আশীর্বাদের মাধ্যমে সকালের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা নবদম্পতিকে কপালে কুমকুম ও হলুদ ছুঁইয়ে আশীর্বাদ করেন।


বিকেলে কোডাভা রীতিতে দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। কর্ণাটকের কোডাগু অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানে পোশাক, সংগীত ও পারিবারিক সম্মান প্রদর্শনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কনের পারিবারিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে এই পর্বের আয়োজন করা হয়, যেখানে দুই পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের উপস্থিতিতে আচার সম্পন্ন হয়।


দুই ভিন্ন সংস্কৃতির সমন্বয় এই বিয়েকে অনন্য করে তুলেছে। তেলেগু ও কোডাভা সংস্কৃতির ঐতিহ্য একসঙ্গে মিশে বিয়ের অনুষ্ঠানকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।


অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় উদয়পুরের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত একটি বিলাসবহুল হোটেলে। লেকঘেরা সৌন্দর্য এবং রাজকীয় স্থাপত্যশৈলীর মধ্যে সাজানো হয়েছিল বিয়ের মণ্ডপ। অতিথি তালিকা ছিল সীমিত; শুধু দুই পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিনোদনজগতের কয়েকজন অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ব্যক্তিগত মুহূর্তের গোপনীয়তা বজায় রাখতে মোবাইল ফোন ব্যবহার ও ছবি তোলার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।


কনের পোশাক ছিল মরচে-কমলা রঙের সোনালি পাড়ের শাড়ি, সঙ্গে ভারী সোনার গয়না। তিনি বহুস্তর হার, বাহুবন্ধ, মাঙ্গটিকা, কড়া ও বড় ঝুমকা পরেছিলেন। খোলা ঢেউ খেলানো চুলে জুঁই ফুলের মালা তাঁর সাজকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এই বিশেষ পোশাক ডিজাইন করেছেন অনামিকা খান্না। অন্যদিকে বিজয় পরেছিলেন আইভরি রঙের ধুতি-স্টাইল পোশাক, সঙ্গে গাঢ় লাল রঙের অঙ্গবস্ত্র, যেখানে সূক্ষ্ম সূচিকর্মে অরণ্য ও মন্দিরের নকশা ছিল।


বরমালার সময় আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়, যখন দুজনই একে অপরকে মালা পরানোর সময় চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

বিয়ের ভোজে দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়। কলাপাতায় ভাত, সাম্বর, রসম, বিভিন্ন সবজি ভাজা, কারি, পায়েস ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়। পানীয় হিসেবে ডাবের পানি দেওয়া হয়। কনের পরিবার থেকে বরের পরিবারকে নারকেল, পানপাতা, ফল, মিষ্টি, হলুদ ও কুমকুম উপহার দেওয়া হয়, যা শুভ ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।


বিজয়ের মা পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে নববধূ রাশমিকার হাতে বংশপরম্পরায় পাওয়া সোনার চুড়ি পরিয়ে দেন, যা নতুন পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁকে স্বাগত জানানোর প্রতীক।


বিয়ের আগে একাধিক প্রাক্-বিবাহ অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়। গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে হলুদ ও কমলা ফুল দিয়ে মণ্ডপ সাজানো হয়। সন্ধ্যায় সংগীতানুষ্ঠানে অতিথিরা গান ও নাচে অংশ নেন। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রাশমিকা বিজয়ের জন্য ‘অঙ্গারোঁ’ গানে নাচ পরিবেশন করেন। পরে নবদম্পতিও একসঙ্গে নাচেন।


প্রি-ওয়েডিং আয়োজনে আধুনিকতার ছোঁয়াও ছিল। কে-ড্রামা থিমে একটি বিশেষ আয়োজন করা হয়, যা রাশমিকার কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহের প্রতিফলন। পাশাপাশি পুল পার্টি, ওয়াটার ভলিবল ও বন্ধুত্বপূর্ণ ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা হয়।


‘গীত গোবিন্দম’ ছবির শুটিং থেকে রাশমিকা ও বিজয়ের প্রেমের গুঞ্জন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ‘ডিয়ার কমরেড’ ছবিতে তাঁদের রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করে। যদিও প্রকাশ্যে তাঁরা কখনো সম্পর্কের কথা স্বীকার করেননি, একসঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ভ্রমণ তাঁদের ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেয়।


বিয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছায় ভরে যায় ভক্তদের টাইমলাইন। ভক্তদের দেওয়া নাম ‘বিরশ’ এখন আনুষ্ঠানিক দম্পতির পরিচয় হয়ে উঠেছে। উদয়পুরের আকাশের নিচে পরিবারের আশীর্বাদে শুরু হলো তাঁদের নতুন জীবন।