নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো এবং ইন্টারনেট শাটডাউনের ঘটনায় প্রবাসীরা গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, দোহা, রোম, টরন্টো ও জেদ্দা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও মালদ্বীপের নানা শহরে প্রবাসীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে অংশ নেন। 

এক পর্যায়ে তাঁরা ঘোষণা দিয়ে সম্মিলিতভাবে রেমিট্যান্স পাঠানোও বন্ধ করে দেন। এতে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশের সংকট আরো বেড়ে যায়। রিজার্ভ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেখ হাসিনা দেশ চালাতে হিমশিম খেতে থাকেন। হাসিনা পতনের অন্যতম কর্মসূচি ছিল ওই রেমিট্যান্স বয়কটের ডাক।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাই আন্দোলনে প্রবাসীদের ভূমিকা ছিল বহুমুখী। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তাঁরা বাংলাদেশ দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সামনে বিক্ষোভ ও সমাবেশ আয়োজন করেন। স্থানীয় মিডিয়া ও মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্দোলনের পক্ষে সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশে সহায়তা করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইংরেজি ও স্থানীয় ভাষায় তথ্য প্রচার করে আন্তর্জাতিক মহলে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মীদের আইনি সহায়তা ও চিকিৎসা খরচের জন্য অর্থ পাঠানো ছাড়াও কিছু প্রবাসী সংগঠন পোস্টার, ব্যানার ও লিফলেট সরবরাহ করে। রাজনৈতিকভাবে তাঁরা বসবাসরত দেশের সংসদ সদস্য, কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে গণতান্ত্রিক দাবিগুলোর পক্ষে সমর্থন আদায় করেন।

কয়েকটি দেশে হাসিনা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উত্থাপনের জন্যও লবিং করেন। অনলাইনে ভিডিও, লাইভ আলোচনা ও হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আন্দোলনের খবর প্রচার এবং সরকারি প্রচারণা মোকাবেলায় ফ্যাক্টচেক ও বিকল্প তথ্য সরবরাহে সক্রিয় থাকেন প্রবাসীরা। এই দৃঢ় অবস্থান ও সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশে থাকা আন্দোলনকারীদের মনোবল বাড়িয়ে তোলে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ থেকে ফ্যাসিবাদের বিদায় ঘটে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুক, এক্স, ইউটিউবসহ নানা প্ল্যাটফর্মে প্রবাসীরা স্পষ্ট বার্তা দেন ‘বুলেট নয়, সমাধান চাই।

দেশে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এর প্রতিবাদে তারা রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে দেন এবং অন্যদেরও একই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান, যা সরকারের জন্য বড় অর্থনৈতিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়।

সে সময়ে হাসিনা সরকারের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করায় ৫৭ জন বাংলাদেশি কঠোর শাস্তির মুখে পড়েন, কেউ ১০ বছরের, কেউ আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। অবশেষে অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় তাঁরা সবাই মুক্তি পান।

সৌদিপ্রবাসী আরিফ হাসান জুয়েল জানান, ‘দেশের অবস্থা দেখে আমরা খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। বসে বসে ভাবছিলাম কিভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে পারি। দেশের ভাইদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই রেমিট্যান্স শাটডাউনের ডাক দিয়েছিলাম আমরা। প্রবাসীরা যদি রেমিট্যান্স শাটডাউনের ঘোষণা না দিত, শেখ হাসিনা এত দ্রুত দেশ ছাড়ত না। দেশকে স্বৈরশাসনের হাত থেকে রক্ষা করতেই ওই কর্মসূচি ছিল আমাদের। বিদেশে আসতে আমাদের পাঁচ-ছয় লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়, যা যেত হাসিনার নেতাকর্মীদের পেটে। আশাকরি পরবর্তী সরকার আমাদের এসব কষ্ট লাঘব করবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকেই মাসিক রেমিট্যান্স ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। কিন্তু জুলাই মাসে তা নেমে আসে ১৯০ কোটি ৯০ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.২ শতাংশ কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা ও টানা পাঁচ দিনের ইন্টারনেট শাটডাউনের কারণে রেমিট্যান্স পাঠানো ব্যাহত হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রবাস আয় ছিল ১৯৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ (সিএসপিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রবাসীরা প্রথমবারের মতো তাঁদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার জানান দিয়েছেন। আগের সরকারের আমলে তাঁরা মারাত্মকভাবে অতিষ্ঠ ছিলেন। রেমিট্যান্স বন্ধ হওয়ায় সরকারের টনক নড়ে এবং তার ফলেই আওয়ামী সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে।’ 

শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ একটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গেছে। তখন দেশের পাশপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁদের অনেকে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল। তা ছাড়া প্রবাসীরা দেশটা কোন দিকে যাবে বুঝতে পারছিল না। তাই তারা পাঠায়নি। তবে এক বছর পর সেই চিত্র পুরোপুরি উল্টো। ২০২৪ সালে ২৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে।’