সুন্দরবনের অন্যতম বনজ সম্পদ গোলপাতা দেখতে গোল না—বরং অনেকটা নারকেল পাতার মতো লম্বা ও প্রশস্ত। বৃহত্তর খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট ও সহজপ্রাপ্যতার কারণে ঘর তৈরিতে এই গোলপাতার ব্যবহার ছিল সাধারণ বিষয়। সময়ের ব্যবধানে সেই গোলপাতা এখন জায়গা করে নিচ্ছে নামী-দামি রিসোর্ট ও কফিশপের ছাউনিতে। একই ধারাবাহিকতায় গোলপাতা দিয়েই নির্মিত হয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাফেটেরিয়া।


খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে একটি ক্যাফেটেরিয়া ছিল, যা প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো। সেটির স্থানে বর্তমানে নির্মাণ করা হচ্ছে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)। এর বিকল্প হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছে এই ব্যতিক্রমী ক্যাফেটেরিয়া। উদ্বোধনের পর থেকেই এটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। 

 প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বর্গফুটের ক্যাফেটেরিয়াটি নকশা যৌথভাবে করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক শেখ সিরাজুল হাকিম ও সহকারী অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম।

ক্যাফেটেরিয়াটির চারপাশ খোলা, ফলে একে প্রথাগত অর্থে ঘরও বলা যায় না, আবার কেবল চালা হিসেবেও চিহ্নিত করা কঠিন। সামনের ও পেছনের অংশ প্রায় ত্রিভুজাকৃতির। পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস চলাচলের সুবিধার জন্যই এই খোলামেলা নকশা রাখা হয়েছে। পেছনে রয়েছে হোগলাবন, পাশে বাঁশঝাড়, আর অন্য দিকে একটি ছোট পুকুর, যেখানে পদ্ম ও শাপলা তাদের স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ করে সবাইকে।


যেখানে রান্না হয়, কেবল সেখানেই দেয়াল দেখা যায়। ক্যাফেটেরিয়ার ছাউনি দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতায়। চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন তাপমাত্রা সর্বোচ্চ থাকে, তখন গোলপাতার ছাউনির কারণে ইটের তৈরি পাকা ঘরের তুলনায় এখানে তাপমাত্রা ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম অনুভূত হয়। শীতকালে আবার অধিকাংশ স্থানে মৃদু রোদের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ব্যবহৃত গোলপাতা প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় এর স্থায়িত্বও স্বাভাবিকের তুলনায় ৪–৫ বছর বেশি হবে বলে জানান তাঁরা।

এই ক্যাফেটেরিয়ায় একসঙ্গে দুই শতাধিক মানুষের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। সামনের অংশ শিক্ষার্থীদের জন্য এবং পেছনের অংশ শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত। সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার থেকে শুরু করে রাতের খাবার সবই পাওয়া যায় এখানে।

সবুজে ঘেরা, রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গোলপাতার ছাউনির ক্যাফেটেরিয়া নিস্তরঙ্গ সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি এখন শুধু খাবারের স্থান নয়; বরং শিক্ষার্থীদের প্রশান্তির ঠিকানা, গল্প-আড্ডার কেন্দ্র এবং অনেকের জন্য নিঃসঙ্গ বিকেলের সঙ্গী।
ইংরেজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী জিহাদি বিনের মতে, “ক্যাফেটেরিয়ার পরিবেশ স্বাস্থ্যকর এবং খাবারের মান তুলনামূলক ভালো। ভবিষ্যতেও এই মান বজায় থাকবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

তিন বছরের ব্যবধানে ক্যাফেটেরিয়ায় এসেছে নতুন মুখ, নতুন গল্প। বদলায়নি কেবল এর পরিবেশ—সবুজে ঘেরা গোলপাতার ছাউনির নিচে তৈরি হওয়া সেই স্বস্তির আবহ।