সরকারি হিসাবে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। দামও নির্ধারিত। তবু বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। বিভিন্ন জেলায় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, তৈরি হচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা।
সরকার নির্ধারিত দামে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রির কথা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকদের দিতে হচ্ছে ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৪৬০ টাকা পর্যন্ত। ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। কেজিপ্রতি ২ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বোরো মৌসুমে বাড়তি চাপ
দেশে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। এই মৌসুমে উৎপাদিত হয় সারা বছরের চালের বড় অংশ। বোরো সম্পূর্ণভাবে বীজ, সার ও সেচনির্ভর। ফলে উপকরণের দাম বাড়লে সরাসরি বাড়ে উৎপাদন খরচ। শুধু ধান নয়, আলু, পেঁয়াজ, সরিষা ও বিভিন্ন সবজির ক্ষেত্রেও একই প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভরা মৌসুমে সামান্য ঘাটতি বা সরবরাহে ব্যত্যয়ও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে শেষ পর্যন্ত চালের বাজারেও চাপ পড়বে।
কাগজে মজুদ, মাঠে সংকটের অভিযোগ
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের গুদামে ৫ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া, ৩ লাখ টনের বেশি টিএসপি, ৫ লাখের বেশি ডিএপি ও ৩ লাখ টনের বেশি এমওপি মজুদ রয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে বিভিন্ন জেলার কৃষকরা বলছেন, নির্ধারিত ডিলারের কাছে সার চাইলে ‘সরবরাহ শেষ’ বলা হচ্ছে। পরে খুচরা দোকানে বেশি দামে সেই সারই পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রসিদ চাইলে সার না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
জেলায় জেলায় একই চিত্র
চুয়াডাঙ্গা, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, রাজশাহী, যশোর, খুলনা, নওগাঁ ও বগুড়াসহ একাধিক জেলায় বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট পরিবার সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
কয়েকটি জেলায় অভিযোগ রয়েছে, একই ব্যক্তি বা তার স্বজনের নামে একাধিক ডিলারশিপ রয়েছে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কৃষকরা।
নীতিমালা সংশোধন, তবু অস্থিরতা
সার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে সরকার ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯’ সংশোধন করেছে। তবে সংশোধিত নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই পুরনো চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উৎপাদন খরচ বাড়ছে
দিনাজপুরের এক কৃষক জানান, এক বিঘা জমিতে বোরো আবাদে খরচ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। লাভ থাকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। সেখানে সারের দাম বাড়লে লাভ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। অনেক কৃষক বিকল্প হিসেবে ভুট্টা চাষে ঝুঁকছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, ধান চাষ অলাভজনক হয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সরকারের অবস্থান
কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, বেশি দামে সার বিক্রির প্রমাণ মিললে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কঠোর থাকবে বলেও জানান তিনি।
তবে মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





