সৃষ্টির প্রতিটি পরতে পরতে বিরাজমান রয়েছে এক সর্বশক্তিমান স্রষ্টার নিখুঁত পরিকল্পনা ও অস্তিত্বের স্পষ্ট নিদর্শন। মানুষের সহজাত স্বভাব বা ‘ফিতরাহ’ এই সত্যকে উপলব্ধি করে। কোনো মানুষ যদি একেবারে একাকী, বাহ্যিক প্রভাব ও মতাদর্শহীন পরিবেশেও থাকেন, তবু তার হৃদয় নির্দেশ করে—এই বিস্ময়কর বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের একজন স্রষ্টা ও পরিচালক রয়েছেন।
পবিত্র কোরআনেও এই সহজাত সত্যের প্রতি ইঙ্গিত এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
\"সুতরাং তোমার মুখ সব সময় সৎপথে তোমার ফিতরাহর প্রতি ফিরিয়ে নাও, যাঁর ওপর তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টি কখনো পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়। এটাই হলো সঠিক ধর্ম, কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ তা বুঝতে পারে না।”
(সুরা : রূম, আয়াত : ৩০)
দিগদিগন্তে ছড়িয়ে থাকা প্রমাণ
স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণে কোরআন শুধু আত্মার গভীরে নয়, বরং বিশ্বজগতের বিস্তৃত পরিসরেও আল্লাহর নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছে।
আল্লাহ বলেন,
\"আমি তাদের দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে নিদর্শনাবলি প্রদর্শন করব, যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি সত্য। তোমার প্রভুর পক্ষে কি যথেষ্ট নয় যে তিনি সব কিছুর ওপর সাক্ষী?\"
(সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৫৩)
এ আয়াতে ‘দিগন্ত’ বলতে বোঝানো হয়েছে—আকাশ, পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ, তারাগুচ্ছ, বাতাস, বজ্রপাত, বিদ্যুৎ, উদ্ভিদসহ প্রকৃতির অসংখ্য বিস্ময়কর উপাদান, যা স্রষ্টার অস্তিত্বের জ্বলন্ত প্রমাণ।
কোরআনে বিজ্ঞানসম্মত বিস্ময়
১. উচ্চতায় অক্সিজেনের ঘাটতি
আল্লাহ বলেন,
“যাকে তিনি পথ দেখাতে চান, তিনি তার বক্ষ প্রশস্ত করে দেন; আর যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তিনি তার বক্ষ সংকুচিত করে দেন, যেন সে আকাশে আরোহণ করছে।”
(সুরা : আনআম, আয়াত : ১২৫)
এই আয়াত আজকের বৈজ্ঞানিক সত্যের সঙ্গে মিলে যায়। উচ্চতায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুচাপ ও অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়, ফলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
২. কক্ষপথে গ্রহ ও নক্ষত্র
আল্লাহ বলেন,
“প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে সাঁতার কাটছে।”
(সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৪০)
বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, গ্রহ-নক্ষত্রের গতি নিখুঁত কক্ষপথে পরিচালিত হয়। এদের চলাচল বিশৃঙ্খল নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ।
৩. পৃথিবীর কম্পন ও পর্বতের গতি
আল্লাহ বলেন,
“তুমি পর্বতমালাকে ভাববে স্থির; অথচ তারা মেঘের মতো চলমান। এসব আল্লাহরই সৃষ্টি, যিনি সবকিছু নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন।”
(সুরা : নামল, আয়াত : ৮৮)
আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ সব সময়ই অদৃশ্যভাবে কম্পিত থাকে, যা পর্বতের চলাচলেরও ইঙ্গিত দেয়।
৪. সমুদ্রের অন্তরাল
আল্লাহ বলেন,
“তিনি দুটি সমুদ্রকে মিলিত হতে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল, যাতে তারা একে অপরের সীমা অতিক্রম না করে।”
(সুরা : রহমান, আয়াত : ১৯-২০)
১৯৬২ সালে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, দুই ভিন্ন ঘনত্ব ও লবণাক্ততার সমুদ্র একে অপরের সঙ্গে মিশে না, মাঝখানে এক প্রাকৃতিক অন্তরাল বিদ্যমান থাকে।
৫. বৃষ্টিপাত ও ভূমির সাড়া
আল্লাহ বলেন,
“তুমি ভূমিকে মৃত দেখবে, কিন্তু যখন আমি তার ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন তা কাঁপে, ফুলে ওঠে এবং সব জোড়ায় শস্য জন্মায়।”
(সুরা : হজ, আয়াত : ৫)
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় জানা যায়, বৃষ্টির পানিতে জীবাণু, ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষুদ্র অঙ্গাণুগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার ফলে মাটি কাঁপে ও শস্য উৎপন্ন হয়।
সৃষ্টির প্রতিটি দিকেই ছড়িয়ে রয়েছে এক স্রষ্টার নিদর্শন। আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো আজ পবিত্র কোরআনের বাণীকে একের পর এক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এসব নিদর্শন কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং গভীর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমেও প্রমাণিত এক মহাসত্য—সৃষ্টির প্রতিটি পরতে স্রষ্টার অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে অবিচ্ছিন্নভাবে।





