ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোটের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ হলেও এখনো চূড়ান্ত হয়নি আসন সমঝোতা। এতে জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ, নির্বাচন প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তপশিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। এই সময়সীমাকে সামনে রেখে আসন বণ্টন চূড়ান্ত করার চাপ বাড়ছে জোটের শরিকদের ওপর। যদিও জোট নেতারা বলছেন, আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং দু-এক দিনের মধ্যেই ৩০০ আসনের সমঝোতা চূড়ান্ত হতে পারে।

গত রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ১০ দলীয় জোটের ঘোষণা দেন। এর আগে জোটে ছিল জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। পরে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) যুক্ত হলে জোটটি ১১ দলে বিস্তৃত হয়।

জোটের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সর্বশেষ আলোচনায় জামায়াত শরিকদের জন্য প্রায় ১১০টি আসন ছাড়ার চিন্তা করছে। প্রস্তাবিত বণ্টনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩৫-৪০টি, এনসিপি ৩০টি, খেলাফত মজলিস ১৫টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১০টি, এবি পার্টি ৩টি, এলডিপি ৩টি, বিডিপি ২টি, জাগপা ৩টি, খেলাফত আন্দোলন ৪টি এবং নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি আসন পেতে পারে। তবে এসব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

জানা গেছে, জোটভুক্ত দলগুলোর ৬০০-এর বেশি প্রার্থী ৩০০ আসনের বিপরীতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আসন সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ায় দরকষাকষির কৌশল হিসেবে অতিরিক্ত প্রার্থী রাখা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আসন সমঝোতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এনসিপিকে ঘিরে। কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত এনসিপিকে ১০টির বেশি আসন দিচ্ছে না—এমন খবর ছড়ালেও এনসিপি নেতারা তা নাকচ করেছেন। তাদের দাবি, ৩০ আসন নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে।

এনসিপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে প্রায় ২৫টি আসন চূড়ান্ত হয়েছে। দলের লক্ষ্য ৩৫-৪০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, ইসলামী আন্দোলন জোটে থাকবে কি না, তার ওপর চূড়ান্ত হিসাব নির্ভর করবে। ইসলামী আন্দোলন না থাকলে প্রায় ৪০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ তৈরি হবে।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, এনসিপি ১০টির কম আসন পাচ্ছে—এমন তথ্য সঠিক নয়। আমরা ৪৪টি আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছি এবং অধিকাংশই বৈধ হয়েছে। জোটের আসন বণ্টন এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে ৩০-৩৫টির কম আসন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

একই বক্তব্য দিয়েছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি বলেন, আসন সমঝোতার আলোচনা খুব ইতিবাচকভাবে চলছে এবং শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে।

এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, জোটের প্রার্থী হিসেবে দলের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন আসনে নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত। এর মধ্যে ঢাকা, রংপুর, কুমিল্লা, পঞ্চগড়, নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জামায়াতের প্রার্থীরা এনসিপি প্রার্থীদের সমর্থনে সরে দাঁড়িয়েছেন। আরও কয়েকটি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার আলোচনা চলছে।

এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে জামায়াতের আসন সমঝোতা নিয়ে এখনো পুরোপুরি দূরত্ব ঘোচেনি। যদিও দুই দলের নেতারা আবারও আলোচনায় বসেছেন। জোটের নেতারা বলছেন, বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে কোনো ভাঙনের সম্ভাবনা নেই।

জানা গেছে, শুরুতে ইসলামী আন্দোলন ১২০-১৫০টি আসনের দাবি জানালেও পরে তা কমিয়ে ৭০টিতে নামিয়েছে। জামায়াত এ বিষয়ে এখনো সম্মতি দেয়নি। এ নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরদিনই অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাদের দল বহু আসনে শক্ত অবস্থানে থাকলেও সে অনুযায়ী সমঝোতা হচ্ছে না।

ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ আছে, তবে আলোচনা চলমান। ১৯ জানুয়ারির মধ্যেই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগেই সবকিছু চূড়ান্ত হবে। আসন সমঝোতা নিয়ে বড় কোনো সংকট নেই। শঙ্কার চেয়ে অপপ্রচারই বেশি, আর যেকোনো সংকট আলোচনা দিয়েই সমাধান করা হবে।