নবুওয়াতের আলো জাহিলিয়াতের অন্ধকার দূর করলেও, মানুষ বারবার পুরনো ভুলে ফিরে যায়। সেই কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছিলেন—তাঁর উম্মতের মধ্যেও কিছু জাহিলী প্রথা ফিরে আসবে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে তিনি চারটি এমন কু-প্রথার কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো মুসলমানরা সহজে পরিত্যাগ করতে চাইবে না।
তিনি বলেন—
“আমার উম্মতের মধ্যে জাহিলি যুগের চারটি প্রথা রয়ে গেছে: (১) বংশের গৌরব, (২) অন্যের বংশের খোটা দেওয়া, (৩) নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি চাওয়া, (৪) মৃতের জন্য বিলাপ করে কান্নাকাটি করা।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৩৪)
১. বংশের গৌরব প্রকাশ
জাহিলি সমাজে বংশ ও গোত্র ছিল অহংকারের মূল উৎস। ইসলাম সে ধারণা ভেঙে দিয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, “মানুষের মর্যাদা বংশে নয়, তাকওয়ায়।” (সুরা হুজুরাত: ১৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও বংশের দিকে তাকান না, বরং তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।” (সহিহ মুসলিম, ২৫৬৪)
আজও সমাজে “উচ্চবর্ণ”, “অভিজাত পরিবার” বা “মূলধারার মানুষ”—এই ধারণাগুলো সেই পুরনো জাহিলি মানসিকতারই প্রকাশ।
২. অন্যের বংশের খোটা দেওয়া
অন্যকে তার বংশ বা জাত নিয়ে তুচ্ছ করা ইসলামি দৃষ্টিতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা একে অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান করো না, কটূনামেও ডাকো না।” (হুজুরাত: ১১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে অন্যের বংশের খোটা দেয়, সে জাহিলি যুগের অনুসারী।” (আবু দাউদ, ৫১১৬)
এ ধরনের আচরণ সমাজে বিভেদ, অহংকার ও ঘৃণা ছড়ায়—যা উম্মাহর ঐক্য নষ্ট করে।
৩. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা
জাহিলি যুগে অনেকেই বিশ্বাস করত, নক্ষত্র বা গ্রহ বৃষ্টির কারণ। ইসলাম একে শির্ক বলে ঘোষণা করেছে। নবীজী (সা.) বলেছেন, “যে বলে—আমরা অমুক তারার কারণে বৃষ্টি পেয়েছি, সে আল্লাহকে অস্বীকার করেছে।” (সহিহ মুসলিম, ৭১)
আজও “প্রকৃতির ইচ্ছায় বৃষ্টি হলো” বা “Mother Nature gave rain”—এই ধারণাগুলো সেই পুরনো বিশ্বাসের নতুন রূপ। কুরআন স্পষ্ট করে বলে, “আল্লাহই আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন।” (সুরা রূম: ২৪)
৪. মৃতের জন্য বিলাপ করা
ইসলাম শোক নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু বিলাপ, গাল ছেঁড়া বা অতিরিক্ত আহাজারি করা হারাম ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে বুক পেটায়, কাপড় ফাড়ে এবং জাহিলি ভাষায় বিলাপ করে।” (সহিহ বুখারি ১২৯৪; মুসলিম ১০৩)
হাদিসে উল্লেখ আছে, তওবা না করলে বিলাপকারিণী কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে।
নবীজী (সা.) নিজেও পুত্র ইব্রাহিমের মৃত্যুতে কেঁদেছিলেন, কিন্তু বলেছিলেন—“চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, হৃদয় দুঃখিত হয়, তবে আমরা সেই কথাই বলি যা আমাদের প্রভুকে সন্তুষ্ট করে।” (সহিহ বুখারি, ১৩০৩)
আজকের শিক্ষা
জাহিলি যুগের এই চার ব্যাধি—বংশগৌরব, অন্যকে অপমান, নক্ষত্রবিশ্বাস ও বিলাপ—আজও সমাজে নানা রূপে ফিরে এসেছে। কেউ বংশ নিয়ে গর্ব করে, কেউ জাতের নামে বিভেদ সৃষ্টি করে, কেউ আল্লাহর কুদরতকে “প্রকৃতির শক্তি” বলে আড়াল করে, আবার কেউ শোককে নাটকে পরিণত করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন—“জাহিলি যুগের অহংকার পরিত্যাগ করো, তা নরকের আগুনে পোড়াবে।” (ইবনে মাজাহ, ৩৯২৭)
তাই এখন সময় এসেছে উম্মতের প্রতিটি মানুষকে সেই চার ব্যাধি থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহভীতির পথে ফিরে আসার।
আমরা যেন হই সেই উম্মতের সদস্য, যারা জাহিলি প্রথা নয়, বরং নবীজির শিক্ষা ও আল্লাহর আনুগত্যে পরিচালিত এক সত্যিকার সভ্য সমাজের উত্তরাধিকারী।





