ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল, জোট রাজনীতির পুনর্বিন্যাস এবং নতুন শক্তির উত্থানের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে জাতীয় পার্টির ভরাডুবি। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে কোনো না কোনোভাবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব রাখা দলটি এবার প্রথমবারের মতো শূন্য হাতে সংসদের বাইরে রয়ে গেল। তিন দশকের রাজনৈতিক যাত্রায় এমন ফল তাদের জন্য নজিরবিহীন।


১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচন দিয়েই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন, সংঘাত ও জোট রাজনীতির মধ্য দিয়ে আরও কয়েকটি নির্বাচন হয়েছে। এ সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি জাতীয় পার্টিও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে ছিল। কখনও এককভাবে, কখনও জোটে থেকে তারা সংসদে উপস্থিতি বজায় রেখেছে। কিন্তু ত্রয়োদশ নির্বাচনে এসে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।


অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাস পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণের পর বিএনপি জোট শক্ত অবস্থানে রয়েছে, দ্বিতীয় স্থানে জামায়াত জোট। বাকি কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র ও অন্যান্য প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।


জাতীয় পার্টি এবার ২৫৮টি আসনে প্রার্থী দিলেও একটিতেও জয় পায়নি, যা দলটির ইতিহাসে প্রথম। রাজনৈতিক উত্থান-পতনের বহু অধ্যায় পার করেও এমন শূন্যতা আগে দেখেনি তারা।


রংপুর বিভাগ, যা দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানেও বড় ধস নামে। রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের তৃতীয় হন। একসময় এই আসন থেকেই তিনি সংসদে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একইভাবে মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ আসনে তৃতীয় স্থানে থেকে পরাজিত হন। রংপুর বিভাগের ছয়টি আসনের পাঁচটিতে জয় পেয়েছে জামায়াত, একটি গেছে অন্য দলের দখলে। প্রতীকী ও বাস্তব দুই দিক থেকেই এটি জাতীয় পার্টির জন্য বড় ধাক্কা।


১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি সামরিক শাসনকে বেসামরিক রূপ দিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পরের দুই নির্বাচনে দলটি সাফল্য পেলেও ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর আর আগের প্রভাব ফিরিয়ে আনতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট সরকারে অংশ নেয় এবং ২০১৪ সালের পর সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন জোটে থেকেও বিরোধী দল হওয়ার কারণে নানা সমালোচনার মুখে পড়ে।


এরশাদের মৃত্যুর পর নেতৃত্ব সংকট ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি দলটিকে আরও দুর্বল করে। বর্তমানে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) নামে নিবন্ধিত দলটি কার্যত দুটি অংশে বিভক্ত।


অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি এবং একতরফা ভোটে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি।


সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। পুরোনো শক্তির পতন, নতুন জোটের উত্থান এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের এই অধ্যায় আগামী দিনের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।