কুবি প্রতিনিধি : ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস ও আমাদের জাতীয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, বরং আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও স্বপ্নের এক উজ্জ্বল প্রতীক। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল এই দিনে।
৩০ লাখ শহীদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আজও জাতির চেতনায় অম্লান।


স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে আজ প্রশ্ন জাগে– স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ গড়ার পথে আমরা কতটা এগিয়েছি? স্বাধীনতা অর্জন যেমন গৌরবের, তেমনি তা রক্ষা করা আরও বড় দায়িত্ব। রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক বৈষম্য ও নানা সংকটের মাঝেও নতুন প্রজন্মের মাঝে স্বাধীনতার চেতনা এখনও জীবন্ত– এমনটাই উঠে এসেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীদের ভাবনায়।

ফার্মেসি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর আনজুম সাজন বলেন, 'স্বাধীনতা কতটা অপার, কতটা অনির্বচনীয় একটি শব্দ। ছোট্টবেলায় রজনীকান্ত সেনের “স্বাধীনতার সুখ” কবিতাটি প্রথম পড়ার সময় এর গভীরতা সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারিনি। পরে, যখন বড় হলাম আর ২৪ বছরের দীর্ঘ বঞ্চনা ও সংগ্রামের ইতিহাস পেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কাহিনী পড়লাম, তখন কিছুটা উপলব্ধি হলো এই স্বাধীনতা কতটা প্রতীক্ষিত, কতটা আকাঙ্ক্ষিত ছিল।'

তিনি বলেন, 'তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়, আমরা কি সত্যিই সেই স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছি? এই স্বাধীনতা কি আমাদের দিয়েছে এক নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি? উত্তর খুঁজতে গেলে আজও চোখে ভেসে ওঠে জল ও স্থলপথে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঝরে পড়া অসংখ্য প্রাণ, আর স্বাধীনতার পর থেকে দুর্নীতির শিকলে বারবার জর্জরিত এক বাংলাদেশ। 

তিনি আরও বলেন, 'তবুও মানুষ হিসেবে আমি আশাবাদী। অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলো আসবেই। এই বিশ্বাসেই আজ, মহান স্বাধীনতা দিবসে আমার প্রত্যাশা, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত এই বাংলাদেশ একদিন সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনতার স্বাদ পাবে। এমন এক স্বাধীনতা, যেখানে পথে-ঘাটে হঠাৎ নিভে যাবে না কোনো প্রাণের প্রদীপ, যেখানে ঘুষ ও দুর্নীতির অন্ধকারে হারিয়ে যাবে না কোনো তরুণের স্বপ্ন। সে স্বাধীনতা হোক নিরাপত্তার, ন্যায়ের, আর স্বপ্ন দেখার।' 


বাংলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারহা খানম বলেন, '১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে বাংলাদেশের জন্ম হয়, যা আমাদের জাতির এক নবজন্মের আনন্দ এনে দেয়। আমার কাছে ‘স্বাধীনতা’ মানেই ‘মুক্তি’। মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশকে শোষণ থেকে মুক্ত করেছিলেন। তবে আমি মনে করি, প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই সম্ভব, যখন মানুষ সব ধরনের নিপীড়ন, ভয় ও বৈষম্য থেকে মুক্ত থেকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতায় এখনো খুন, গুম, বিচারহীনতা, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবসে আমার প্রত্যাশা—শুধু আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও নিরাপত্তা পাবে।'


গণিত বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো: হাসিবুর রহমান নিলয় বলেন, '২৬ মার্চ রক্তের আলোয় জাগ্রত এক জাতির আলোকবর্তিকা। ১৯৭১ সালের এই দিন শুধু পাকিস্তানি শৃঙ্খল ভাঙেনি, বরং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশকে এক নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইতিহাসে যেমন আমেরিকার ১৭৭৬-এর বিপ্লব ও ফ্রান্সের ১৭৮৯-এর বিপ্লব বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তন এনেছিল, তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রমাণ করেছে ছোট জাতিও বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।'

তিনি আরও বলেন, 'আজকের বাংলাদেশ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—সার্বভৌমত্ব রক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। এসব মোকাবিলায় প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতার চেতনা। রাষ্ট্রীয় সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, ব্লু ইকোনমি ও বৈশ্বিক উদ্যোগে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা উন্নয়নের পথে এগোতে পারি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং স্বাধীনতার আলোয় নতুন সম্ভাবনার সূর্যোদয় ঘটাবে।'

ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী মাইনুল ইসলাম বলেন, 'ছোটবেলা থেকেই বন্দী জীবন আমার অপছন্দ, তাই ধীরে ধীরে বড় হওয়ার সঙ্গে স্বাধীনতার মূল্য বুঝতে শিখেছি। ব্যক্তিগত জীবনের সামান্য সীমাবদ্ধতাই যখন কষ্ট দেয়, তখন একটি জাতির স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম কতটা কঠিন ছিল, তা উপলব্ধি করা যায়। ১৯৭১ সালের শহিদদের আত্মত্যাগের কারণেই আমরা আজ একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। ২৬শে মার্চের ঘোষণা ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ, যা আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়েছে। তাই তাদের এই ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের দায়িত্ব।'