চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যেই মিয়ানমারে বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচনের তৃতীয় ও শেষ দফার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই নির্বাচনে সেনাবাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ভূমিধস জয়ের পথে রয়েছে। রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়সহ ৬০টি টাউনশিপে ভোটগ্রহণ শুরু হয় বলে জানিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। তবে বিরোধী পক্ষ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু নয় এবং এটি সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।

প্রায় পাঁচ বছর আগে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর থেকেই দেশটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং ৩৫ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অং সান সু চি এখনো আটক রয়েছেন। তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)সহ একাধিক বিরোধী দল ভেঙে দেওয়ায় রাজনৈতিক মাঠ পুরোপুরি সেনা সমর্থিত ইউএসডিপির অনুকূলে ঝুঁকে পড়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত নিম্নকক্ষে ২০৯টির মধ্যে ১৯৩টি এবং উচ্চকক্ষে ৭৮টির মধ্যে ৫২টি আসনে জয় পেয়েছে ইউএসডিপি। সংবিধান অনুযায়ী সেনাবাহিনী সরাসরি আরও ১৬৬টি আসন পেয়ে থাকে। ফলে ইউএসডিপি ও সেনাবাহিনী মিলিয়ে মোট আসন সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪০০, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ২৯৪ আসনের অনেক বেশি। কমিশন জানিয়েছে, আরও ১৭টি রাজনৈতিক দল সংসদে এক থেকে ১০টি করে আসন পেয়েছে।

বর্তমান সামরিক সরকারের প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং নতুন সংসদ বসলে প্রেসিডেন্ট হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন সংসদ মার্চে অধিবেশন শুরু করবে এবং এপ্রিলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে। যদিও সামরিক সরকার দাবি করছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে ভোটের পুরো প্রক্রিয়াজুড়েই ভয়ভীতি, জবরদস্তি ও ভিন্নমত দমনের ঘটনা ঘটেছে, যা সেনাবাহিনীর ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

নতুন করে প্রণীত ইলেকশন প্রোটেকশন আইনে নির্বাচনের সমালোচনার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। লিফলেট বিতরণ বা অনলাইনে মত প্রকাশের অভিযোগে ইতোমধ্যে ৪০০-এর বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় দফার ভোটের আগেই মিয়ানমারের মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত টম অ্যানড্রুজ নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান এবং এটিকে প্রতারণামূলক বলে অভিহিত করেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহামাদ হাসান পার্লামেন্টে জানান, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ান এই নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি এবং ফলাফল স্বীকৃতি দেবে না। অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের অভাবকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে মান্দালয়ের ৫৩ বছর বয়সী শিক্ষক জাও কো কো মিন্ত ভোরবেলা একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট দিয়ে এএফপি সংবাদ সংস্থাকে বলেন, তিনি খুব বেশি আশা করেন না, তবে একটি ভালো দেশ দেখতে চান এবং ভোট দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন বলে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। আগের দুই দফার নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৫৫ শতাংশ, যা ২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনের প্রায় ৭০ শতাংশ উপস্থিতির তুলনায় অনেক কম।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্সের তথ্যমতে, গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৭,৭০৫ জন নিহত হয়েছে এবং ২২,৭৪৫ জন এখনো আটক রয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফল চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে প্রকাশিত হওয়ার কথা থাকলেও, ইউএসডিপি সোমবারই বিজয় ঘোষণা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের নির্বাচনে অং সান সু চির এনএলডি দল ইউএসডিপিকে বিপুলভাবে পরাজিত করেছিল। এর পরই ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে।