ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে। ৫ আগস্ট–পরবর্তী রাজনীতির নতুন বিতর্ক ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে এই অধিবেশন থেকে। পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হবে।
প্রথম দিনেই আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এসব অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করবেন।
\r\nআজকের অধিবেশন ঘিরে দলীয় কৌশল ঠিক করতে গতকাল বুধবার সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা আলাদা সংসদীয় দলের বৈঠক করেছেন। তবে এখনো পরিষ্কার হয়নি—প্রথম বৈঠকে কে সভাপতিত্ব করবেন এবং নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কে হচ্ছেন। বৈঠকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দলের অবস্থান অনুযায়ী ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
\r\nঅন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অবস্থান হলো—গণভোটে পাস হওয়া জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়ন করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কাঠামো, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন পদ্ধতি এবং কয়েকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
\r\nসংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীই এসব পদে নির্বাচিত হন। তবে এবার ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর জন্য প্রস্তাব করেছে বিএনপি।
\r\nজুলাই সনদেও এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছিল। তবে বিরোধীদলীয় বৈঠকের পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হওয়ার কথা। কিন্তু তারা খণ্ডিতভাবে নয়, পুরো প্যাকেজ আকারে সনদের বাস্তবায়ন চান।
\r\n২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারায় আওয়ামী লীগ সরকার। এর প্রায় দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এর আগে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দ্বাদশ সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন।
\r\nসংবিধান অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন ডাকতে হয়। সে অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ১২ মার্চ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। আজ বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে অধিবেশন শুরু হবে। সাধারণত সংসদের প্রথম অধিবেশন তুলনামূলক দীর্ঘ হয়। কত দিন চলবে, তা কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে নির্ধারিত হবে।
\r\nস্পিকারের শূন্য চেয়ার
\r\n১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবার স্পিকারের পদ শূন্য রেখে নতুন সংসদের অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। এর আগে নবম সংসদের সময় বিএনপি মনোনীত স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়েছিল এবং তিনিই সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান।
\r\nতবে এবার সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসিরউদ্দিন।
\r\nআজকের বৈঠকের শুরুতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদ নেতা তারেক রহমান স্বাগত বক্তব্য দেবেন। ওই বক্তব্যে তিনি একজন সংসদ সদস্যকে সাময়িকভাবে সভাপতিত্ব করার আহ্বান জানাবেন। তাঁর সভাপতিত্বেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
\r\nবিদ্যমান সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সাধারণত বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার ছিলেন শামসুল হক টুকু। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শিরীন শারমিন পদত্যাগ করেন এবং শামসুল হক টুকু মামলার আসামি হয়ে কারাগারে আছেন।
\r\nপ্রথম দিনের সম্ভাব্য কার্যসূচি
\r\nসংসদের প্রথম দিনের বৈঠক শুরু হবে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। এরপর সংসদ নেতা একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন যিনি সাময়িকভাবে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।
\r\nএরপর নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। একাধিক প্রার্থী না থাকলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই তাঁদের নির্বাচিত করা হতে পারে। পরে অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য মুলতবি থাকবে। ওই সময়ে সংসদ ভবনেই রাষ্ট্রপতি নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়াবেন।
\r\nএরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন আবার শুরু হবে। পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন, শোক প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনা, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ উত্থাপন এবং কার্য উপদেষ্টা কমিটিসহ কয়েকটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে।
\r\nরাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কটের সিদ্ধান্ত
\r\nনতুন সংসদের শুরুতেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিরোধীদলীয় সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভাষণের সময় তারা সংসদ কক্ষ ছেড়ে লবিতে অবস্থান করবেন বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
\r\nএ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, সংসদের অধিবেশনে তাদের ভূমিকা দৃশ্যমান হবে।
\r\nএর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, তাঁর ভাষণ দেওয়ার নৈতিক অধিকার নেই।
\r\nআওয়ামী লীগ ছাড়া তৃতীয় সংসদ
\r\nছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। ফলে দলটি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
\r\nএর ফলে নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদের সরকারদল আওয়ামী লীগ এবার সংসদে নেই। যদিও অতীতে ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদ এবং ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদেও দলটি অনুপস্থিত ছিল।
\r\nদুই আসনের ফল ঝুলে আছে
\r\n৩০০ আসনের মধ্যে দুটি আসনের নির্বাচনী ফল এখনো স্থগিত রয়েছে। প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে নির্বাচন বাতিল হয়েছে। চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম–৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর ও মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর ফল আদালতের সিদ্ধান্তে স্থগিত রয়েছে। ফলে তারা প্রথম অধিবেশনে অংশ নিতে পারছেন না।
\r\nবাকি ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। বিএনপির মিত্র গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি পেয়েছে একটি করে আসন।
\r\nজামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন নিয়ে বিরোধী দলে বসছে। এনসিপি ছয়টি আসন পেয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে একটি আসন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে।





