ইসলামের তৃতীয় খলিফা ও নবী করিম (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি হজরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.) ছিলেন একজন মহান দানবীর। তার অতুলনীয় দানশীলতা ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও তিনি কখনো জাহেলি যুগের অনৈতিকতায় জড়াননি। বরং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রয়োজনে সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছেন বারবার।
‘যিন্নুরাইন’ উপাধি ও নবীর দুই কন্যার পতি
তিনি নবীজি (সা.)-এর পরপর দুই কন্যা—হজরত রুকাইয়া (রা.) ও উম্মে কুলসুম (রা.)-এর স্বামী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন, যার কারণে তাকে “যিন্নুরাইন” (দুই নূরের মালিক) বলা হয়। ছিলেন ওহির লেখক এবং ইসলামের প্রথম দুই খলিফা আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-এর উপদেষ্টা।
‘গনি’ উপাধিতে পরিচিত ওসমান (রা.) ধনসম্পদে ছিলেন অতুলনীয়। তবে তার দানশীলতা তাকে করেছিল মহান।
তাবুক যুদ্ধ: উট, রৌপ্য ও স্বর্ণে দানবীরতা
তাবুক যুদ্ধের সময় যখন মুসলিম সেনাবাহিনীর বিশাল অর্থনৈতিক প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন তিনি প্রস্তুত করছিলেন একটি বাণিজ্য কাফেলা—২০০ উট ও প্রায় ২৯ কেজি রৌপ্য।
এই পুরো কাফেলা যুদ্ধের জন্য সদকা করে দেন। এরপর আরও ১০০ উট এবং এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা নবীজির (সা.) সামনে এনে দান করেন। নবীজি (সা.) আনন্দে বলেন,
“আজকের পর ওসমান যা করবে, তাতে তার কোনো ক্ষতি হবে না।” (তিরমিজি, হাদিস ৩৭০৩)
রুমা কূপ: চিরস্থায়ী ওয়াকফ
মদিনায় হিজরতের পর মুসলমানদের জন্য পানির তীব্র সংকট দেখা দিলে, তিনি ৩৫ হাজার দিরহামে একটি কূপ কিনে তা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন। আজও সেই কূপ এবং পাশের খেজুরবাগান সৌদি সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
বাগান থেকে আয়ের অর্ধেক দেওয়া হয় এতিম-গরিবদের, বাকিটা জমা হয় ওসমান (রা.)-এর নামে খোলা একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, যা ধর্ম মন্ত্রণালয় পরিচালনা করে।
খাদ্যসংকটে এক হাজার উট সদকা
খলিফা আবু বকর (রা.)-এর শাসনামলে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ওসমান (রা.) শাম থেকে আগত নিজের এক হাজার উটের মালবোঝাই কাফেলা দরিদ্রদের জন্য সদকা করে দেন। ব্যবসায়ীরা তাকে মোটা মুনাফা দিতে চাইলেও তিনি বলেন,
“আল্লাহ আমাকে প্রতিটি দিরহামের বিপরীতে দশ দিরহাম দেবেন। তোমাদের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু নেই।”
এরপর তিনি ঘোষণা দেন,
“এই সব খাদ্যসামগ্রী আমি দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের জন্য দান করলাম।”
তিনি নিজ হাতে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করতে শুরু করেন এবং মদিনার কোনো দরিদ্র পরিবার বাদ পড়েনি।
হজরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর এই দানশীলতা কেবল অর্থসম্পদের দান ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বাস, ভরসা ও উম্মাহর কল্যাণে আত্মনিবেদন। ইতিহাসে তিনি শুধু একজন ধনী সাহাবি নন, বরং সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দানবীর হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।





