প্রতিদিন নীরবে কাজ করে যায় আমাদের ফুসফুস, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এই অঙ্গটির গুরুত্ব বুঝতে পারেন শুধুমাত্র যখন সমস্যার মুখোমুখি হন। আজকাল ফুসফুসের নানা ধরনের রোগ বেড়েই চলেছে। তাই জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব ফুসফুস দিবস। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুসফুসের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন হওয়াও জরুরি। বর্তমানের পরিবেশ দূষণ ও কোভিড-পরবর্তী জটিলতার প্রেক্ষাপটে ফুসফুসের সুস্থতা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারতের দুই বিশেষজ্ঞ—ডা. বিবেক নাঙ্গিয়া, ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান (পালমোনোলজি), ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ডা. শিবা কল্যাণ বিশ্বাস, মারেঙ্গো এশিয়া হাসপাতালের চিকিৎসক—ফুসফুসের বর্তমান ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায় নিয়ে তাদের মতামত দিয়েছেন।

ডা. নাঙ্গিয়ার মতে, ফুসফুস-সংক্রান্ত রোগের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা, সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ), ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, ফুসফুস ক্যানসার, যক্ষ্মা (টিবি), নিউমোনিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা। এসব রোগ দ্রুত বাড়ছে যার প্রধান কারণ—বায়ুদূষণ, ধূমপান এবং কোভিড-পরবর্তী জটিলতা। তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুক চাপা লাগা বা হালকা জ্বরের মতো উপসর্গ অবহেলা করা উচিত নয়।

ডা. বিশ্বাস জানান, এখন তরুণদের মধ্যেও অ্যাজমা, সিওপিডি এবং ফুসফুস ক্যানসারের হার বাড়ছে। এর পেছনে রয়েছে ঘরোয়া দূষণ, কর্মক্ষমতাহীন জীবনধারা এবং ক্রমাগত পরিবেশ দূষণ।

তিনি আরও সতর্ক করেন, কিছু লক্ষণ আছে যা একদমই অবহেলা করা যাবে না। যেমন—

দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা হাঁপানির শব্দ, অল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট হওয়া, বুকের ব্যথা বা সবসময় ক্লান্ত অনুভব করা, ঘন ঘন শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, শিশুদের ক্ষেত্রে খেলাধুলা বা দৈনন্দিন কাজ থেকে অনীহা দেখানো ।

এই উপসর্গগুলো অবহেলা করলে রোগ ধীরে ধীরে জটিল হয়ে ওঠে এবং চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে। কোভিড থেকে সেরে ওঠার পর বহু রোগীর ফুসফুসে ‘ফাইব্রোসিস’ বা স্থায়ী ক্ষতের সমস্যা দেখা যাচ্ছে, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপ ও ফুসফুস পুনর্বাসনের (লাং রিহ্যাবিলিটেশন) প্রয়োজন হয়।

ফুসফুস সুস্থ রাখতে যা করতে হবে:

বিশেষজ্ঞরা বলেন, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম যেমন ডিপ বেলি ব্রিদিং ও পার্সড লিপ ব্রিদিং ফুসফুসকে কার্যকর রাখে। খাদ্যাভ্যাসেও সচেতন হতে হবে—অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার যেমন ব্রকোলি, পালং শাক, বিট, গাজর, কমলা, বেরি, পেয়ারা, হলুদ, রসুন, জিরা ও দারুচিনি ফুসফুসের জন্য উপকারী।

এছাড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন সময়মতো নেওয়া উচিত। ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বর্জন, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত হাঁটা বা সাঁতারের মতো শারীরিক কার্যক্রমও ফুসফুসের স্বাস্থ্য রক্ষায় সাহায্য করে।

চিকিৎসকদের মতে, অনেকেই দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা শ্বাসকষ্টকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে ধরে নেন, যা ভুল ধারণা। সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং সচেতন জীবনযাপনই পারে ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে। তাই ফুসফুসের স্বাস্থ্য রক্ষায় এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।