নোবিপ্রবি প্রতিনিধি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি)। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর নোবিপ্রবিতে মুখোমুখি অবস্থানে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রকাশ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নেওয়ায় পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একাংশ বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে নোয়াখালী জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে একাধিক অভিযোগ উত্থাপন করে। এছাড়াও আগামী সাত দিনের মধ্যে নোবিপ্রবি উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারারকে পদত্যাগ করার আল্টিমেটাম দেয়। পদত্যাগ না করলে কঠোর আন্দোলনের হুমকি প্রদান করা হয়।
এই সময় সংবাদ সম্মলনে উপস্থিত ছিলেন সাদা দলের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর সরকার ও সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল কাইয়ুম মাসুদ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আবিদুর রহমান, অধ্যাপক জামাল উদ্দিন, আবদুর বারেক, মিনহাজুল আবেদীন, জনি মিয়া, মোকাররম হোসেন, সাদ্দাম হোসেন ও মোজাম্মেল হোসেন।
আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একাংশ অভিযোগ করে, বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩৪ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জন জামায়াতপন্থী। বাকি তিনজন বিএনপি ও অন্যান্য মতাদর্শের। এ ছাড়া ২১ জন কর্মকর্তা নিয়োগের মধ্যে ১৯ জন জামায়াতপন্থী।এছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে একমাত্র প্রার্থী নিয়ে নিয়োগ বোর্ড বসানো হয়। তড়িৎ প্রকৌশল (ইইই) বিভাগে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়া এক নারী প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। বিএনপিপন্থী শিক্ষক নেতাদের একাংশের দাবি, ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষকেরা ২৬ হাজার টাকা সম্মানী পেলেও উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার প্রত্যেকে দুই লাখ টাকা করে নিয়েছেন। ভর্তি পরীক্ষার সফটওয়্যার উন্নয়নের নামে ৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়।
বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একাংশের সংবাদ সম্মলনের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান প্রশাসন আজ বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বৃহস্পতিবার উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও অবকাঠামোগত সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
মতবিনিময় সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অপতথ্য প্রচার করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবারের সরাসরি অংশীজনদের পক্ষ থেকে এ ধরনের অশুভ উদ্যোগ খুবই দুঃখজনক এবং সকল অভিযোগ ভিত্তিহীন।
নোবিপ্রবি প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও দলীয়করণের যে অভিযোগ উঠেছে, তার প্রেক্ষিতে তিনি আরো বলেন ‘আমাদের শেষ যে দশজন প্রার্থীকে ভাইবা বোর্ডে ডেকেছি সেই দশজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় কত পেয়েছে তা আছে, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় কত পেয়েছে সেটাও আছে, মৌখিক পরীক্ষায় প্রেজেন্টেশনে কত পেয়েছে সেটাও আছে এবং সেখানে যারা নিয়োগ বোর্ডের মেম্বার আছেন সব নিয়োগ বোর্ডের মেম্বারদের সিগনেচার দেওয়া আছে।
তিনি আরো বলেন, এখন আপনি (অভিযোগকারী শিক্ষকগণ) লিখিত পরীক্ষার খাতা কেটেছেন, লিখিত পরীক্ষায় ডিউটি দিয়েছেন, লিখিত পরীক্ষার খাতা কাটার পর ডিউটি দেওয়ার পর লিখিত পরীক্ষার মার্কে আপনি সিগনেচার করছেন। সিগনেচার করার পরে যোগ্য প্রার্থীকে বিবেচনা করছেন, সেই বিবেচনায় রেজাল্ট পেয়ে নিয়োগ দিয়েছি। তারপরও যদি এখন এসে বলেন যে আমরা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তিদের দিয়েছি এটা খুব দুঃখজনক। উপাচার্য বলেন, ‘আমরা মেধা এবং যোগ্যতাকে প্রায়োরিটি দিয়ে নিয়োগ দিয়েছি। এরমধ্যে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা- আমি আবার বলছি আমরা কোনো জাত, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র—কোনোটাকেই আমরা বিবেচনায় নিইনি। আমরা মেধার বিবেচনায় এই নিয়োগগুলো দিয়েছি।
তিনি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘আপনারা যদি মনে করেন এগুলোর ডকুমেন্ট দেখবেন আমরা প্রস্তুত আছি। এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও ৩০ নম্বর লিখিত পরীক্ষা এবং ৩০ নম্বর প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষাগুলোতে আমি নিজেও যাইনি; আমার প্রোভিসি মহোদয়ের নেতৃত্বে যে রিলেটেড এক্সপার্ট আছে তারা প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় গিয়ে মার্ক দিয়েছে। তারপর সরকারিভাবে নির্ধারিত বোর্ড আছে এবং বোর্ড মেম্বারের মধ্যে যারা আছেন, বোর্ড মেম্বারের সর্বসম্মতিক্রমে ভাইবাতে যে মার্ক দিয়েছে। এই তিনটা মার্ক যোগ করে যেটা পেয়েছেন, সেই মার্কটা দিয়ে সর্বোচ্চ নম্বরের ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা কোনো কিছুই আমরা দেইনি।\"
ওপেন চ্যালেঞ্জ দিয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য বলেন, \"আমরা অলওয়েজ চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলতে পারি আমরা নিয়োগে কোনো অনিয়ম করিনি। এ সংক্রান্ত একটা কপি সবসময় আমার অফিস থেকে আপনারা যদি চান কোন প্রার্থী কত নম্বর পেয়েছিল, আপনারা মোস্ট ওয়েলকাম।”
মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মাঝে আরো উপস্থিত ছিলেন নোবিপ্রবি উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগের চেয়ারম্যান, রেজিস্ট্রারসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের এমন মুখোমুখি অবস্থানে সংকট তৈরির সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।





