রাজধানীর পুরানা পল্টন ও তার আশপাশের কয়েকটি ভবন যেন পরিণত হয়েছে ছোট-বড় রাজনৈতিক দলের ‘আস্তানা’য়। জামান টাওয়ারসহ আশেপাশের তিনটি ভবনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে—১৪টি দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং একটি দলের মহানগর কার্যালয় রয়েছে সেখানে।

রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, রাজনৈতিক ইতিহাস, কেন্দ্রীয় অবস্থান এবং কর্মসূচি দেওয়ার সুবিধার কারণেই পল্টন ও আশপাশের এলাকা আজ রাজনৈতিক দলগুলোর পছন্দের ঠিকানা হয়ে উঠেছে।

পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড ধরে একটু এগোলেই দেখা যায় ১৬ তলা ভবন জামান টাওয়ার। ভবনটির ছাদে গিয়ে ১১ আগস্ট ও ১৪ সেপ্টেম্বর দেখা গেছে, সেখানে রয়েছে তিনটি দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়: ন্যাশনাল লেবার পার্টি, জনতার অধিকার পার্টি (পিআরপি) এবং দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন। একই ছাদে রয়েছে জাগপার মহানগর কার্যালয় এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক দল ‘আপ বাংলাদেশ’-এর অফিস।

ভবনের ৬ষ্ঠ তলায় রয়েছে আমজনতার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। দলটি এবং 'দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন' আত্মপ্রকাশ করে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর।

জামান টাওয়ারের মালিক মিয়া মশিউজ্জামান নিজেই একটি দলের (আমজনতার দল) আহ্বায়ক। তিনি বলেন, “অনেক দল কক্ষ পায় না। রাজনীতিকে উৎসাহ দিতে আমরা কয়েকটি কক্ষ ভাড়া দিয়েছি।” তবে ভাড়ার হার (প্রতি বর্গফুটে ৮০–১২০ টাকা) তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ছাদই অনেক দলের একমাত্র ভরসা।

ছাদে সাতটি কক্ষের মধ্যে একটিতে লেবার পার্টি ও জাগপা একত্রে অফিস করত, তবে এখন সেখানে শুধু লেবার পার্টির কার্যক্রম দেখা যায়। পাশেই জনতার অধিকার পার্টির কার্যালয়, যেটি ২০২২ সাল থেকে সক্রিয়। আরেক কক্ষে আছে 'দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন'-এর অফিস, যদিও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি।

জামান টাওয়ার ছাড়াও তোপখানা রোড, গুলিস্তান, কাকরাইল, বিজয়নগর, সেগুনবাগিচা ও মতিঝিলেও দলীয় কার্যালয়ের ছড়াছড়ি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে—নিবন্ধিত ৫০টি দলের মধ্যে ২৭টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এসব এলাকাতেই। এ ছাড়া নিবন্ধনহীন আরও ১৬টি দলের কার্যালয়ও রয়েছে এখানে।

জাতীয় প্রেসক্লাবের বিপরীত পাশের সরু গলির বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদ ভবনে সাতটি দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় আছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত দুটি—বাংলাদেশ জাসদ ও নাগরিক ঐক্য। অন্যগুলো হলো জাতীয় গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন পার্টি, সিএপিপি, সিপিবি (মার্ক্সবাদী) এবং বাসদ (মার্ক্সবাদী)।

নয়াপল্টন মসজিদ গলির একটি ভবনে তিনটি বিএনপি-ঘনিষ্ঠ দলের কার্যালয় রয়েছে—বাংলাদেশ লেবার পার্টি, প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দল ও বাংলাদেশ জন-অধিকার পার্টি। তবে এসব দল নিবন্ধনহীন। প্রতিদিন খোলা থাকে না, বেশির ভাগ সময় তালাবদ্ধ থাকে।

এ প্রশ্নে বিশ্লেষক ও রাজনীতিকরা বলেন, পল্টনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও অবস্থানই মূল কারণ।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “দলগুলো যখন গঠিত হয়েছে, তখন ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ছিল গুলিস্তান-পল্টন এলাকা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হয়েছে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে। বিএনপিও নয়াপল্টনকেই বেছে নেয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের জন্য।”

ইতিহাস বলছে, পল্টন একসময় ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনানিবাস। পরে সেই জায়গায় গড়ে ওঠে ফাঁকা ময়দান—পল্টন মাঠ। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর এখানেই অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক জনসভা, যেখানে মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। ৬০’র দশকে গণআন্দোলনের সময় পল্টন হয়ে ওঠে প্রতিবাদের কেন্দ্রস্থল।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পুরানা পল্টনে। অনেক ইসলামপন্থী দলও এ এলাকায় কার্যালয় গড়েছে। এ বিষয়ে দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, “আগে থেকেই আমাদের বড় বড় কর্মসূচি হতো পল্টন ময়দান ও বায়তুল মোকাররম এলাকায়। প্রেসক্লাবও কাছেই। তাই কাছাকাছি থাকাই সুবিধাজনক।”

২০২৫ সালের জুনে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে ১৪৭টি দল। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক দলই শুধু নামেই দল, বাস্তবে তাদের কোনো সাংগঠনিক কাঠামো বা জনপ্রিয়তা নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “বড় দলগুলো সুপারশপের মতো, আর ছোট দলগুলো মুদিদোকান—একজনের শোডাউন মাত্র। অনেক সময় তারা নিজেরাও জানে না কী চায়।” তিনি আরও বলেন, “বড় দলগুলো এসব ছোট দলকে জোটে রাখে, যেন প্রতিপক্ষের জোটে না যায়। আবার ছোট দলগুলোও কিছু সুবিধা পায়—আসন, পদ বা ঠিকাদারি।”

পল্টন এখন আর শুধু একটি জায়গা নয়—এটি হয়ে উঠেছে রাজনীতির কেন্দ্র। অতীত ইতিহাস, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ভৌগোলিক সুবিধা এবং প্রভাব বিস্তারের কৌশলের কারণে রাজনৈতিক দলগুলো আজও এই এলাকাকে আঁকড়ে আছে।