আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত সাময়িকীটির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, গত ১৮ মাস আগে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর এই নির্বাচনই হবে দেশের প্রথম জাতীয় ভোট। ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
দ্য ইকোনমিস্ট তারেক রহমানকে একটি খ্যাতনামা রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের পর তিনিই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে শক্ত দাবিদার। তারেক রহমানের সম্ভাব্য বিজয় নিয়ে এই পূর্বাভাস এসেছে টাইম ম্যাগাজিন, ব্লুমবার্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুরূপ বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক মেরামতের সূচনা করতে পারে।
সাময়িকীটি গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘটনাও তুলে ধরে। এতে বলা হয়, বুলেটপ্রুফ বাসে দেশে ফেরার সময় উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের ভিড়ে তার বাসটি ধীরগতিতে এগোচ্ছিল, যেন উপস্থিত মানুষ তাকে কাছ থেকে দেখতে পারে।
দ্য ইকোনমিস্ট উল্লেখ করেছে, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন হয়নি। দেশের প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে আনুমানিক ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিআইপিএসএসের গবেষণা পরিচালক শাফকাত মুনিরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, দীর্ঘদিন ভোটের কোনো মূল্য ছিল না, তবে এখন রাজধানীর রাস্তায় আবার নির্বাচনী ব্যানার দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন তত্ত্বাবধানই হবে শেষ বড় দায়িত্ব। অধিকাংশ মানুষের মতে, সরকারটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এমন সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি কমাবে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করা।
জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, দলটি সংযত শাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের অগ্রগতি শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। দলটি এবারের নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি এবং সংসদীয় অভিজ্ঞতাও সীমিত। এই প্রেক্ষাপটকে তারেক রহমানের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে সাময়িকীটি, কারণ বিএনপি জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে।
সাময়িকীটি আরও জানায়, দীর্ঘদিন বিএনপি পরিচালিত হয়েছে তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। এর আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তার বাবা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন না করলেও নির্বাচিত হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরি, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং বছরে পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তারেক রহমানের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই হবে তার সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতদের বিচার দাবি করলেও প্রতিশোধের রাজনীতির বিরোধিতা করেছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর তারেক রহমান আগের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিচয় দিচ্ছেন।





