ভারতে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের প্রতি সম্প্রতি বাড়ছে নানা ধরনের হয়রানি ও বৈষম্যের ঘটনা। প্রতিবেশী দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে দিল্লি, গুড়গাঁও, গুজরাট, আসাম, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও ডিটেনশনের ঘটনা ক্রমেই উদ্বেগজনক মাত্রা নিচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর তথ্যানুসারে, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত অন্তত ১,৮৮০ জন বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানকে ভারতীয় নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছে। যাদের অনেকেই বৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছিলেন বা ভারতীয় পরিচয়পত্র রাখতেন। ভাষা এবং ধর্মের ভিত্তিতে এই আচরণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন।

ওড়িশায় ৪৪৪ জন বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিককে বাংলাদেশি ভেবে আটক করা হলে পরে যাচাই করে দেখা যায় তাদের মধ্যে ২৭৭ জন প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় নাগরিক। এর পরও তাদের মুক্তি দিতে সময় নেয় প্রশাসন, যা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সমালোচনার জন্ম দেয়।

এমনকি পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে বাংলা ভাষা দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত, সেখানেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভাষাগত মিলের কারণে কিছু নাগরিককে বাংলাদেশি সন্দেহে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার কেন্দ্রীয় সরকারের এমন পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিযুক্ত করেছেন ‘ভাষাগত এবং ধর্মীয় বৈষম্য’ সৃষ্টি করার জন্য।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন ভারতের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মুসলিম ভোটারদের প্রভাব কমাতে এবং অভিবাসন ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেই কেন্দ্রীয় সরকার এই কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। অনেকের মতে, বাংলাদেশি বলে সন্দেহভাজনদের টার্গেট করার মাধ্যমে বিজেপি সরকারের একটি উদ্দেশ্য হতে পারে নিজ দেশে বিরোধীদের ভোট ব্যাংক দুর্বল করা।

এছাড়া, বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টাও এর পেছনে কাজ করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এবং কিছু রাজনৈতিক শক্তিকে সুবিধা করে দিতে এধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার।

বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলমান এই পদক্ষেপে এখন দুই দেশের সাধারণ মানুষই উদ্বিগ্ন। অনেক বাংলাদেশি নাগরিক যারা বৈধভাবে ভিসা নিয়ে ভারতে যান, তারাও এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। ভারতের অভ্যন্তরেও অনেক বাঙালি মুসলিম এখন নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে দেখছেন।

এই পরিস্থিতি দ্রুত নিরসনে উভয় দেশের কূটনৈতিক সংলাপ ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।