ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ তার বান্দাদের মাঝে মাঝে পরীক্ষা করেন। এসব বিপদে মানুষ তার অসহায়ত্ব বোঝে এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাইতে ফিরে আসে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ এসব ঘটনার কথা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহতায়ালা সূরা আনআমে বলেন—
“আপনার আগেও তো আমি বহু জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি; এরপর তাদের দারিদ্র্য-দুর্ভিক্ষ, দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন করেছি, যেন তারা বিনম্র-নত হয়।” (আয়াত ৪২)
“যখন আমার আজাব তাদের ওপর পৌঁছল তখন কেন তারা বিনীত হলো না? বরং তাদের হৃদয়গুলো কঠিন হয়ে গেল। তারা যা (অবাধ্যতা) করে যাচ্ছিল শয়তান তা তাদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল।” (আয়াত ৪৩)
“অতঃপর তাদের যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তারা ভুলে গেল। তখন আমি তাদের জন্য সব কিছুর দরজা খুলে দিলাম। তারা যখন ওই সব পেয়ে অহংকারী হয়ে পড়ল তখন অকস্মাৎ তাদের পাকড়াও করলাম; ফলে সহসাই তারা গভীর দুঃসহ-হতাশাগ্রস্ত হলো।” (আয়াত ৪৪)
ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ সময়ে মানুষকে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়তে, দোয়া করতে এবং দান-সদকা করতে হবে। হাদিসে এসেছে, দান-সদকা বিপদ-আপদ দূর করে (বুখারি)। আরও এসেছে, “যে ব্যক্তি দুনিয়াবাসীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করে, আসমানওয়ালা তার প্রতি দয়া করেন।” (তিরমিযি)
ভূমিকম্পের সময় পড়ার জন্য সহীহ হাদিসে কোনো নির্দিষ্ট দোয়া নেই। তবে বান্দা মন থেকে যেকোনো দোয়া করতে পারে। আর বড় বিপদের সময় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইউনুস আলাইহিস সালামের দোয়া। তিনি গভীর সংকটে পড়ে বারবার এই দোয়া করেছিলেন, আর আল্লাহ তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
আরবি: لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ، إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।
অর্থ: তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র ও মহিমান্বিত। আমি নিশ্চিতভাবে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।
ওমর ইবন আব্দুল আজিয (রা.) তার অধীনস্থ গভর্নরদের লিখে বলতেন, ভূমিকম্প হলে যেন মানুষকে দান-সদকা করতে উৎসাহিত করা হয়।
নেতাদের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তারা জনগণকে সঠিক পথে চলার নির্দেশ দেবেন, দোষ-ত্রুটি থেকে ফিরিয়ে আনবেন এবং আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকবেন। কোরআনে বলা হয়েছে—
“আর বিশ্বাসী পুরুষরা ও বিশ্বাসী নারীরা পরস্পর একে অন্যের বন্ধু। তারা সৎকাজে আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে। আর যথাযথভাবে নামাজ আদায় করে ও যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এসব লোকের প্রতিই আল্লাহ অতিসত্বর করুণা বর্ষণ করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবা: ৭১)
এ ছাড়া আল্লাহ বলেন—
“আর যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন।” (সূরা তালাক: ২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যতের কিছু বিপর্যয়ের লক্ষণও বর্ণনা করেছেন। তিরমিযির (হাদিস ১৪৪৭) বর্ণনা অনুযায়ী, সমাজে যখন অবৈধ সম্পদ, খেয়ানত, জাকাতকে জরিমানা মনে করা, মায়ের অবমাননা, পিতার প্রতি অবহেলা, মসজিদে শোরগোল, নিকৃষ্ট লোকের নেতৃত্ব, খারাপ কাজকে জনপ্রিয়তা অর্জনের উপায় বানানো, বাদ্যযন্ত্র ও নারী শিল্পীর প্রসার, মদ পান এবং পূর্বসূরিদের গালমন্দ ব্যাপক হবে, তখন তীব্র বাতাস ও ভয়াবহ ভূমিকম্প দেখা দেবে।
ইতিহাসেও দেখা যায়, অনেক জাতি আল্লাহর শাস্তি হিসেবে ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়েছে। এখনো এই দুর্যোগ এমন এক ঘটনা যা পুরোপুরি প্রতিরোধ করার প্রযুক্তি মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি।
তাই এসব বিপদের সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও নিরাপত্তা চাওয়াই সবচেয়ে বড় আশ্রয়। একই সঙ্গে পাপ থেকে দূরে থাকা এবং সৎকাজে দৃঢ় থাকা জরুরি।





