মালয়েশিয়ায় অবৈধ প্রবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ। রাজধানী কুয়ালালামপুর, সেলাঙ্গর, পেনাং ও জোহরসহ বিভিন্ন রাজ্যে প্রতিদিনই বাণিজ্যকেন্দ্র, নির্মাণ প্রকল্প, বাজার, রেস্তোরাঁ ও আবাসিক এলাকায় ধরপাকড় চলছে।
অভিযানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি, ইন্দোনেশীয়, মিয়ানমার, নেপালি ও পাকিস্তানি নাগরিক আটক হচ্ছেন। বিশেষ করে চৌকিট, জালান সুলতান আজলান শাহ, গোম্বাক ও বান্দার বারু এলাকার মতো অভিবাসী অধ্যুষিত স্থানে হঠাৎ অভিযান চালানো হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশ ও শ্রম দপ্তরও অনেক সময় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছে।
আটক ব্যক্তিদের বেশিরভাগই ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ বা শর্ত ভঙ্গ করেছেন। তাদের ইমিগ্রেশন ডিপোতে পাঠানো হচ্ছে এবং বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারলে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অভিবাসন দেশের আইনশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য ও শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি বৈধ পথে শ্রমিক আনার প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনাও করছে সরকার।
অভিযানে বৈধ কাগজপত্রধারীরাও আতঙ্কে রয়েছেন। কাজ শেষে ফেরার পথে অনেকেই হঠাৎ ধরপাকড়ে পড়ছেন। এ কারণে দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের সবসময় বৈধ কাগজপত্র বহনের পরামর্শ দিয়েছে।
জনশক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার টিকিয়ে রাখতে হলে বৈধ শ্রমিক আনার প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে। না হলে অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা কমানো কঠিন হবে।
মানবাধিকার সংগঠন নর্থ-সাউথ ইনিশিয়েটিভ (এনএসআই) জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসীর জীবনমান উন্নয়ন ও অধিকার রক্ষায় ১৮ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের সময় প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলমের কাছে এসব প্রস্তাব হস্তান্তর করা হয়।
এনএসআইয়ের প্রস্তাবনায় রয়েছে: অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণ, আটক শ্রমিকদের আইনি সহায়তা, অসুস্থ ও মৃত শ্রমিকদের দ্রুত প্রত্যাবাসন ও ক্ষতিপূরণ, প্রতারক এজেন্ট ও পাচার সিন্ডিকেট দমন, পাসপোর্ট নবায়ন সহজ করা, নারী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, অভিবাসী শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং জরুরি হেল্পলাইন চালু।
শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন রকম। বাংলাদেশি শাহেদুল ইসলাম জানান, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে মালয়েশিয়ায় এসেছেন, কিন্তু নিয়মিত বেতন পান না, আবার ভিসা জটিলতায় সবসময় আটক হওয়ার ভয় থাকে। আরেকজন বলেন, কর্মস্থলে বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হতে হয়, নিরাপদ পরিবেশ জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহ মনে করেন, বৈধ অভিবাসন শুধু মানবিক দায় নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনও। বৈধভাবে কাজ করলে প্রবাসীদের আয় বাড়বে এবং মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ উভয় দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রবাসী কমিউনিটির নেতারা বলছেন, এনএসআইয়ের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার শ্রম সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার অভিযান যেমন কঠোর আইন প্রয়োগের উদাহরণ, তেমনি এটি প্রবাসীদের জন্য বাড়তি উদ্বেগেরও কারণ। তবে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা চালু করা গেলে এই সংকট অনেকটাই কমে আসবে।





