দেশি পণ্যকে বিশ্ববাজারে পরিচিত করা, বিদেশি ক্রেতা–বিক্রেতাদের সঙ্গে দেশি উদ্যোক্তাদের সংযোগ তৈরি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। তবে তিন দশক পর এসে সেই লক্ষ্য থেকে অনেকটাই সরে গেছে এই আয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি বছরের ৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা নামেই কেবল আন্তর্জাতিক, বাস্তবে এটি এখন মূলত একটি বিনোদন ও খুচরা বিক্রিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।


\r\n

১৯৯৫ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) যৌথভাবে মেলার যাত্রা শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল দেশি শিল্পপণ্যের আন্তর্জাতিক প্রচার এবং বিদেশি ক্রেতাদের মাধ্যমে রপ্তানি আদেশ সংগ্রহ। প্রথম দিকে বিদেশি স্টল ও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলার চরিত্র বদলে যায়। সাধারণ ক্রেতাকেন্দ্রিকতা বাড়তে থাকে, আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমতে থাকে।


\r\n

চলতি বছর পূর্বাচলে স্থায়ী অবকাঠামোয় আয়োজিত মেলায় ৩২৪টি স্টল থাকলেও বিদেশি প্যাভিলিয়ন রয়েছে মাত্র ১১টি। হাতেগোনা কয়েকটি দেশের প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও বিদেশি ক্রেতা বা বড় ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। রপ্তানি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত রপ্তানি আদেশ, অথচ এ ক্ষেত্রে প্রতিবছরই হতাশা থেকে যাচ্ছে।


\r\n

মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই যে চিত্র দেখা যায়, তা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর চেয়ে অনেকের কাছে হকারি বাজারের মতো মনে হয়। হাঁকডাক, খুচরা পণ্য বিক্রি এবং নিম্নমানের খাদ্যপণ্যের আধিক্য নিয়ে দর্শনার্থীদের অভিযোগ রয়েছে। গুলিস্তান, চকবাজার বা নিউমার্কেটের ফুটপাতে যেসব পণ্য দেখা যায়, সেগুলোর পুনরাবৃত্তিই যেন মেলায়। এতে মেলার মূল উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।


\r\n

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মেলায় প্রতারণা বা অনিয়মের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে ইতোমধ্যে কয়েকটি দোকানকে জরিমানাও করা হয়েছে।


\r\n

রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলোর মতে, অধিকাংশ স্টলে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বদলে স্থানীয় বাজারের জন্য উৎপাদিত বা মানহীন পণ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। এ কারণে তৈরি পোশাকসহ বড় রপ্তানি খাতের ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহ কম। বিজিএমইএ নেতারা প্রকাশ্যেই বলছেন, প্রকৃত রপ্তানি আদেশ আসে বিশেষায়িত বস্ত্র বা ডেনিম মেলা থেকে, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা থেকে নয়।


\r\n

মেলা ঘুরে দেখা গেছে, এটি এখন মূলত রাজধানী ও আশপাশের মানুষের জন্য এক মাসব্যাপী বিনোদন ও কেনাকাটার কেন্দ্র। পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরি, খাবার আর খুচরা কেনাকাটাই এখানে প্রধান আকর্ষণ। ব্যবসায়ীরাও স্বীকার করছেন, রপ্তানি না হলেও দেশীয় বিক্রিতে তারা লাভবান হচ্ছেন।


\r\n

ইপিবির কর্মকর্তারা বলছেন, মাসব্যাপী মেলাকে আন্তর্জাতিক মানে নেওয়া কঠিন। ভিসা, কাস্টমস, পরিবহন ও আবাসনসহ নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে তাদের দাবি, মেলাটি ব্র্যান্ডিং ও নেটওয়ার্কিংয়ের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।


\r\n

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা কখনোই রপ্তানিকারকদের জন্য কার্যকর ছিল না। বরং ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের পণ্য বেশি কেনাবেচা হয়েছে। তার মতে, ইপিবির গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপোর মতো আয়োজনই রপ্তানি বৃদ্ধিতে বেশি সহায়ক।


\r\n

ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, মেলার সময়সীমা ৩০ দিন থেকে কমিয়ে এক সপ্তাহ করা, খাতভিত্তিক প্যাভিলিয়ন, বিদেশি ক্রেতাদের জন্য আলাদা বি-টু-বি জোন এবং মানহীন খুচরা স্টল নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলাকে প্রকৃত অর্থে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়া কঠিন।


\r\n

তিন দশক পেরিয়েও মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ এই মেলা এখন অর্থনৈতিক কূটনীতির প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এক মাসের বড় বিনোদন ও কেনাকাটার উৎসব হিসেবেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।