আন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ ফের সংগঠিত হওয়ার তৎপরতা শুরু করেছে। প্রকাশ্যে রাজনীতিতে না নামলেও সংগঠনের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, রাজধানীমুখী কর্মসূচি ও সহিংসতার ছক কষা হচ্ছে দলীয় নির্দেশনায়।


গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই দেশজুড়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ঢাকায় আনা এবং বিভিন্ন গোপন বৈঠকের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ‘ধানমন্ডি ৩২’, ‘ইউনূস হটাও’, ‘এফ ৭১ গেরিলা’, ‘প্রিয় স্বদেশ’, ‘বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম’ প্রভৃতি নামের হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক গ্রুপ ব্যবহার করে অপপ্রচার, গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানোর কাজ চলছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মফস্বলের বহু নেতাকর্মী ঢাকায় আত্মগোপনে থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।


গোপন বৈঠক সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৮ জুলাই বসুন্ধরার কে বি কনভেনশন সেন্টারে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দাবি তুলে সহিংস কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়। বৈঠকের সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগের ভিত্তিতে কনভেনশন সেন্টারের ম্যানেজারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।


এ বৈঠকের মূল সংগঠক ছিলেন মেজর (অব.) সাদিকুল হক সাদিক, যিনি সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বরগুনা ও গোপালগঞ্জ থেকে কর্মীদের এনে ঢাকায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। বসুন্ধরাসহ রাজধানীর চারটি স্থানে এমন প্রশিক্ষণ হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে, যার ভিডিও প্রমাণ মুছে ফেলা হয়েছে।


পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সবাই সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় এবং ‘প্রিয় স্বদেশ’, ‘বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম’, ‘এফ ৭১ গেরিলা’সহ গোপন গ্রুপের সদস্য বলে জানা গেছে।


জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার হওয়া সোহেল রানা ও শামীমা নাসরিন জানিয়েছেন, মেজর সাদিকের তত্ত্বাবধানে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে সরকার উৎখাতের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।


এ প্রসঙ্গে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, \"নিষিদ্ধ ঘোষণা শুধু কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না। যারা প্রকাশ্যে সংগঠিত হচ্ছে এবং সহিংসতার পরিকল্পনা করছে, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।\"


তিনজন রাজনৈতিক নেতার মতে, সরকারের অতিরিক্ত নমনীয়তাই নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর পুনরুত্থানে সহায়ক হচ্ছে। অনেক হামলাকারী এখনও প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন, অথচ তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিচার হয়নি।


জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ফেসবুক পেজে মন্তব্য করেন, “জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শক্তিগুলোকে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, \"আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন কোনো রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার না হয়। অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।\"