তীব্র শীতে গত দুই মাসে ঠাণ্ডাজনিত রোগে সারা দেশে ৩১ জন মারা গেছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলায় ১৫ জন, খুলনা জেলায় ছয় জন, ময়মনসিংহ জেলায় চারজন, সিলেট জেলায় তিনজন, নরসিংদী জেলায় দুজন এবং চুয়াডাঙ্গা জেলায় একজন মারা গেছে। অন্যদিকে দেশের হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে ঠাণ্ডাজনিত রোগীর চাপ। গড়ে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ জন রোগী।
ভর্তি রোগীদের ৭০ শতাংশ ডায়রিয়া এবং ৩০ শতাংশ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখা সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, গত ১ নভেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৭৯ হাজার ৪২৯ জন ঠাণ্ডাজনিত রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ভর্তি রোগীর মধ্যে ৫৫ হাজার ৬৮৩ জন ডায়রিয়ার এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের রোগী ২৩ হাজার ৭৪৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের ছয়টি জেলায় ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বেশি। জেলাগুলো হলো নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও চাঁদপুর। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বেশি দেখা দিয়েছে নরসিংদী জেলায়। এই জেলায় হাসপাতালে ভর্তি রোগী চার হাজার ১৩৯ জন।
রপর চট্টগ্রামে এক হাজার ২৯৩ জন, কক্সবাজারে এক হাজার ১৩৯ জন, সিলেটে এক হাজার ১৩৪ জন এবং চাঁদপুরে ৭৫৭ জন।
ডায়রিয়া বেশি দেখা দিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। এই জেলায় রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে চার হাজার ৬৫৭ জন। এরপর চট্টগ্রামে তিন হাজার ৮৬০ জন, কক্সবাজারে তিন হাজার ২৮২ জন, নরসিংদীতে দুই হাজার ৩৩৯ জন এবং সিলেটে দুই হাজার ২০৪ জন।
চিকিৎসকদের মতে, এ সময় প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
ঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখন শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দিকাশি, শ্বাসকষ্ট এবং অ্যালার্জিজনিত জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
শিশু হাসপাতালে শয্যাসংকট : এক বছরের মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে কেরানীগঞ্জ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে অপেক্ষা করছিলেন মা আকলিমা আক্তার। একটু পর পর মেয়ের নাক মুছিয়ে দিচ্ছিলেন। এক সপ্তাহ হয় মেয়ের ঠাণ্ডা লেগেছে। আকলিমা বলেন, ‘বাড়ির কাছের এক ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়াইছিলাম, কিন্তু ঠাণ্ডা কমে নাই। নিউমোনিয়া হয়ে যায় কি না, এই ভয় লাগতাছে। তাই এখানে নিয়া আসছি।’
আকলিমার মতো অনেকে তাঁদের শিশুসন্তানদের ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন। দেড় বছরের ইয়াসিনের পুরো শরীর গরম কাপড়ে জড়ানো। জ্বর-কাশি কমছে না। দুই দিন ধরে শুরু হয়েছে ডায়রিয়াও। শিশুটির বাবা রাসেল জানালেন, চিকিৎসক ভর্তি করাতে বলেছেন। কিন্তু শয্যা না থাকায় চিকিৎসক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেছেন।
শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে ইয়াসিনের মতো আরো অন্তত ২০ জন শিশুর অভিভাবককে পাওয়া গেছে, যাঁরা শয্যা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বহির্বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক ডা. মাহফুজ হাসান আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৯০ শতাংশ রোগী আসছে জ্বর-কাশি-নিউমোনিয়া নিয়ে। গুরুতর রোগীদের বেশির ভাগের বয়স এক বছরের কম। এরপর বেশি রোগী আসছে ডায়রিয়া নিয়ে। এসব রোগীর জ্বরও থাকছে।’
হাসপাতালের রেজিস্ট্রার (বহির্বিভাগ) ডা. সুমাইয়া লিজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় ২০ শতাংশ রোগীর ভর্তির প্রয়োজন হচ্ছে। এসব রোগীর প্রায় সবাই গুরুতর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। কিন্তু শয্যা ফাঁকা না থাকায় বেশির ভাগ রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে।’
হাসপাতালটির নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে একটি শয্যাও খালি নেই। চিকিৎসকরা জানান, প্রাথমিক চিকিৎসার পর অনেক শিশুকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং অবস্থার অবনতি হলে ভর্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে অনেক মৌসুমি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
হাসপাতালটির ওয়ার্ডগুলোতে শিশু রোগীরা কষ্টে কাতরাচ্ছে। তিন মাস বয়সী সুপ্তা জন্মের পর থেকে ঠাণ্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছে। গত অক্টোবরে সে টানা প্রায় ১৫ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ছাড়পত্র পাওয়ার তিন দিনের মাথায় ফের অসুস্থ হয়ে পড়লে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে। দ্বিতীয়বার ভর্তির সময় তার নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তৃতীয় দফায় ভর্তি হয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ দিন হাসপাতালে রয়েছে সুপ্তা। এর মধ্যে কয়েক দিন তাকে আইসিইউতেও থাকতে হয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু শ্বাসতন্ত্র (পালমোনোলজি) বিভাগের অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শীতকালে শিশুদের মধ্যে ফ্লু, সর্দিকাশি ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এ সময়টায় অভিভাবকদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি। নিয়মিত গোসল প্রয়োজন হলেও অপরিণত নবজাতকদের ক্ষেত্রে দেরিতে ও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গোসল করানো উচিত, যাতে ঠাণ্ডা না লাগে। নবজাতকদের সব সময় গরম রাখতে হবে এবং যেসব শিশু খেতে পারে, তাদের বাইরের খোলা খাবার বা খোলা জুস দেওয়া যাবে না।’
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন ডা. প্রবীর সরকার। তিনি বলেন, ‘শীতকালে বেশির ভাগ রোগই ভাইরাসজনিত। শিশুর জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।’





