নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার এবং পুরুষদের যৌনাঙ্গ ক্যানসারের হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, এর মূল কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি তিনজন পুরুষের মধ্যে একজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন, যা থেকে ভবিষ্যতে হতে পারে ক্যানসার।
\r\nবিশ্বব্যাপী নারীদের মধ্যে ক্যানসারজনিত মৃত্যুতে চতুর্থ স্থানে রয়েছে জরায়ুমুখ ক্যানসার। বাংলাদেশে এই রোগ নারীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর কারণ। সাধারণত ৩৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই ক্যানসার বেশি দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, বিশ্বের মোট জরায়ুমুখ ক্যানসারজনিত মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে।
\r\nস্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বাসব মুখোপাধ্যায় জানান, এইচপিভির প্রায় ১০০টি ধরন রয়েছে। এর মধ্যে ‘টাইপ ৬’ ও ‘টাইপ ১১’ তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং তা থেকে সাধারণত আঁচিল বা গুটি দেখা দেয়। তবে ‘টাইপ ১৬’ ও ‘টাইপ ১৮’ সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক—এগুলো থেকেই প্রধানত ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
\r\nকলকাতার চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. দীপান্বিতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের হাসপাতালে আগত নারীদের ৭০ শতাংশই জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত। তাদের অধিকাংশই আসেন স্টেজ থ্রি অবস্থায়, যখন চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে।”
\r\n২০০৬ সালে প্রথম বাজারে আসে এইচপিভি ভ্যাকসিন। এটি শরীরে ভাইরাস প্রবেশের আগে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুই ধরনের— কোষীয় ও অ্যান্টিবডি। এইচপিভি ভাইরাস উভয় প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলে, তবে এইচপিভি ভ্যাকসিন সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। প্রথম ডোজ নেওয়ার এক মাস পর অ্যান্টিবডি তৈরি শুরু হয় এবং ৬ মাস পর তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই অ্যান্টিবডি দীর্ঘদিন শরীরে স্থায়ী হয়ে ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে।
\r\nচিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের জন্য দুই ডোজের এইচপিভি ভ্যাকসিন সবচেয়ে কার্যকর। প্রথম ডোজ নেওয়ার ৬ মাস পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। কেউ যদি ১৪ বছরের মধ্যে টিকা না নেয়, তবে ১৫ থেকে ২৬ বছর বয়সীদের জন্য তিনটি ডোজ নিতে হবে—প্রথম ডোজের দুই মাস পর দ্বিতীয় এবং ছয় মাস পর তৃতীয় ডোজ।
\r\nভারতের বিহার রাজ্যে ইতোমধ্যে ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের জন্য বিনামূল্যে এইচপিভি ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেখানে সিরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে ৯৪ লাখ ডোজ অর্ডার দেওয়া হয়েছে।
\r\nআশার খবর হলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি নতুন এইচপিভি ভ্যাকসিন আনার পরিকল্পনা করেছে, যা এক ডোজেই সম্পন্ন হবে এবং ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত নেওয়া যাবে। এটি ক্যানসার প্রতিরোধে আরও কার্যকর ও সহজলভ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
\r\nবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা, সময়মতো টিকা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে জরায়ুমুখ ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।





