তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি সংক্রান্ত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারাকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (৮ জুলাই) ১৩৯ পৃষ্ঠার এই রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
বিচারপতি ফারাহ মাহবুব (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর রায়টি ঘোষণা করেন।
রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ২০ ও ২১ ধারা, এবং ৭ ক, ৭ খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদগুলোকে বাতিল ঘোষণা করে আদালত বলেন, এসব ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো লঙ্ঘন করেছে।
তবে, আদালত পরিষ্কার করেছে—পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী আইন বাতিল করা হয়নি। জাতীয় সংসদ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিবর্তন করতে পারবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
২০১১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করে। এর ফলে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনগুলো দলীয় সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত আইনগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় ফেরার আইনগত বাধা অনেকটাই দূর হলো।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিক ২০২৩ সালের ১৮ আগস্ট এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। এরপর একাধিক পক্ষ, যেমন বিএনপি, গণফোরাম, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি মামলায় পক্ষভুক্ত হন।
রায়ের অংশ হিসেবে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধান বিলুপ্তির ধারা ৪৭-কেও সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হিসেবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের দ্বাদশ সংশোধনী মোতাবেক গণভোটের বিধান পুনরায় চালু হয়েছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর আরও কিছু দিক: সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে উল্লেখ করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, নির্বাচনের সময়সীমা ৯০ দিনের পরিবর্তে পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্ধারণ, জাতীয় চার মূলনীতি (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা) পুনর্বহাল, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রেখে অন্যান্য ধর্মের সমমর্যাদা নিশ্চিত, ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ।
এই রায়ের মধ্য দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর সবকিছু বাতিল না হলেও, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের মূল অংশ বেআইনি ঘোষিত হওয়ায়, দেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি আরও বৈধতা ও সংবিধানসম্মত ভিত্তি পেল। এখন আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়েই নির্ভর করছে বিষয়টির ভবিষ্যত।







