বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য ইউটিউবে ভিডিও দেখছিলাম। শুরুটা এমন, \"বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু ফাঁদ আছে। যেগুলো পড়া শুধু সময় নষ্ট। যেগুলোর কোন প্রয়োজন নেই!\" বিদেশে অধ্যয়নরত পরামর্শদাতা এ পর্যায়ে কয়েকটি বিষয়ের নাম বললেন। শুরুতেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান! তার মত, এত রাষ্ট্রচিন্তাবিদের প্রয়োজন নেই! চিন্তার এই জায়গাটাতেই আমার কিছু বক্তব্য আছে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের মত নির্মাণাধীন একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট থেকে উৎসারিত রাষ্ট্রচিন্তা।
বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ। এটা সম্ভাবনাময়। এই বিশাল জনগোষ্ঠী শুধু খাবারের জন্য যে কাজ করবেন এবং টাকা খরচ করবেন সেটা পরিমাণের বিবেচনায় অনেক, মোটকথা একটা ভালো বাজার। এবং এ কারণে এই ভূখন্ডটি পুঁজিবাদীদের জন্যও বিশাল সুযোগ।
কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠী সবচেয়ে সংকটে পড়ে রাজনীতির ক্ষেত্রে। কারণ, এখানকার রাজনীতিতে এমন কিছু দ্বন্দ্ব বা বিতর্ক আছে কিংবা সেসব জিইয়ে রাখা হয়েছে যেন তার কোনভাবেই সমাধান সম্ভব নয়। এবং এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ।
মনে রাখি, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিকাশের সেই সময় ও পরিবেশের কথা। যখন ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা \"ইনডালজেন্স চুক্তিসহ\" (চার্চের:টাকার বিনিসয়ে পাপ, দায়মুক্তিসহ সকল ক্ষমতা চর্চার ক্ষমতা) নানান আর্থিক চুক্তির নামে জনগণের উপর ভয়াবহ নিপীড়ন করেছিল। রাষ্ট্র বলে আদৌও কোন কিছু ছিলনা। যাজক ও চার্চই ছিল সব।
সেই সময়ে নিকালো মেকিয়াভ্যালী, টমাস হবস্, রুশো, মার্টিন লুথারের মত বিখ্যাত রাষ্ট্র চিন্তাবীদের চিন্তার মাধ্যমে বিভিন্ন বিপ্লব হয়েছিল। ধরে নেই, আজকের আধুনিক রাষ্ট্র সেই আধুনিক রাষ্ট্র চিন্তার মাধ্যমেই হয়েছে।
আবার একজনের রাষ্ট্রচিন্তা-ই যে সব, তাও নয়। বরং ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমেই বর্তমান সময়টা এসেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রচিন্তার উপাদানগুলো ধ্রুবও না। বরং আপেক্ষিক। সময় ও চাহিদা অনুযায়ী যা নিয়ত পরিবর্তনশীল।
যেমন নিকালো মেকিয়াভ্যালীবাদে বলা আছে, রাষ্ট্র শাসনের ক্ষেত্রে শাসকের নৈতিকতার কোন প্রয়োজন নেই! রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে শাসক শিয়ালের মত ধূর্ত এবং সিংহের মত শক্তিশালী হবেন! কিন্তু তার এই চিন্তা নিয়ে পরবর্তীতে সমালোচনার জন্ম হয়েছে।
দেখা যায়, পৃথিবীর সফল দেশগুলোতে রাষ্ট্রচিন্তায় ধর্মনিরপেক্ষতারও বৈচিত্র্য রয়েছে। আবার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আজকের সময়ে এক ধরনের সাম্রাজ্যিকতাবাদও।
যেমন, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজ্য ভেঙ্গে গেলে তুরষ্ক, ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতা আমদানি করা হয়েছিলো, আমিরিকার সহায়তায় দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার বসানের মাধ্যমে।
কিন্তু যেহেতু সেসব দেশে বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান। কাজেই দেখা গেল বিশ শতকের শেষের দিকেই এসব দেশের রাজনীতিতে পুনরায় ধর্ম ফিরে এসেছে। বাংলাদেশেও বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম। ধর্ম সম্পর্কে তারা শতভাগ সতর্ক না হলেও ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে তাদের আগ্রহ দেখা যায় না।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছু মানুষ রাজকারের ভুমিকা পালন করে, যারা পাকিস্তান ও তৎকালীন সরকারকেও সমর্থন করে। কিন্তু খেয়াল রাখি, যেহেতু এদেশ মুসলমান প্রধান। কাজেই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও বেশিরভাগ মানুষ মুসলিমই ছিলেন। কাজেই আজকের সময়ে এসে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশের সকল মুসলিমকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা গ্রহণযোগ্য নয়। এবং এটাই যৌক্তিক ধর্মীয় রাজনীতি এখানে চলবে কিনা, সেটাও ঠিক করবে এদেশের জনগন।যেমন একনায়কতন্ত্র রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অপছন্দীয় হলেও, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মত দেশের জনগন সেটা মেনে সংবিধান প্রবর্তন করেছেন।
এক্ষেত্রে আরেকটি দিক হল, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি রাজনীতি করেন এদেশের বামপন্থী রাজনীতিবিদরা। যাদের মতাদর্শে বরং সমাজতন্ত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইউরোপের জনগণ মধ্যযুগের ধর্মের নামে যাজকদের অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির জন্য যেমন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এসেছে। তেমনই পুঁজিবাদের নামে আর্থিক শোষনের বিপরীতেই মূলত সমাজতন্ত্র এসেছে। সময়ের সাথে সাথে সেখান থেকে কাল্পনিক সমাজতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র মতাদর্শেরও এসেছে।
এমন বাস্তবতায় বর্তমানে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র চিন্তায় সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প, উন্মুক্ত বাজারের মাধ্যমেপুঁজিবাদের সর্বোচ্চ বিস্তারের ক্ষেত্রে বামপন্থীদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল এদেশে পুঁজিবাদীদের 'মানি ফ্লো'। কিন্তু তা না হয়ে এখানকার বামপন্থীদের সবসময়ের রাজনৈতিক ইস্যু ধর্মনিরপেক্ষতা!
এবং চক্রের আবর্তে আবদ্ধ এই আদর্শিক চিন্তার লড়াই ও রাজনীতি, যা এদেশের প্রধান সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। সেখন থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন এদেশের মানুষের আকাঙ্খা ও অবস্থান অনুযায়ী রাষ্ট্রচিন্তা। কোন দলের পুরানো , অবাস্তব চিন্তার জন্য বাংলাদেশের গতি বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
মনে রাখি, মধ্যযুগের সেই ধর্মীয় রাজনীতি ও বিশ শতকের বামপন্থী রাজনীতি বর্তমানে পুরানো নীতি। বাংলাদেশের জনগণের আদর্শ ও বাস্তবতা প্রেক্ষিতে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা অর্থাৎ রাষ্ট্র চিন্তার প্রয়োজন। যা সবাইকে ধারণ করে এগিয়ে যাবে।
লেখক, ইসরাত জাহান মুর্শিদা, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান





