বিগত সরকারের আমলে সাংবাদিকরা নিজেদের এতটা নিচে নামিয়েছেন যে এনিয়ে ভাবতেও লজ্জা হয়। ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের তারা যে শুধু তোষামোদি করে গেছেন তা নয়, তাদের কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা এবং উপঢৌকনও গ্রহণ করেছেন। আরও দুঃখজনক হচ্ছে, এই তৈলচর্চার বিষয়ে তারা এক প্রকার গর্ব করে গেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে তারা প্রকাশ্য ও নির্লজ্জ প্রতিযোগিতায়ও লিপ্ত হয়েছেন। এটা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো লজ্জা, দ্বিধা, সঙ্কোচ কিছুই ছিলো না। বরং তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে এক ধরনের অহংকার পরিলক্ষিত হয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর একটি ফোনালাপ মিডিয়ায় ফাঁস হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের একটি কথিত সাফল্য নিয়ে মন্ত্রী তার বসের সঙ্গে গর্ব করছিলেন। তখন প্রধানমন্ত্রী তাকে এই সফলতা জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য নিউজ করতে বলেন। মন্ত্রী জানান যে তিনি সেটা করছেন এবং ‘১৮টি ক্যামেরা ও সমস্ত সাংবাদিকদের নিয়ে সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াচ্ছেন’। কিন্তু যেভাবে কভারেজ দেওয়া দরকার, সাংবাদিকরা সেটা দিচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রী তখন তার মন্ত্রীকে একটি পরামর্শ দেন এবং সাংবাদিকদের কিছু হাদিয়া (উপঢৌকন) দেওয়ার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী জানেন যে কিছু টাকা পয়সা বা উপহার দিলেই তাদের কেনা যাবে। কথাটি তিনি হাসতে হাসতে এমন তুচ্ছ্য তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন, তাতে বোঝা যায়, সাংবাদিকরা তাদের পেশাদারিত্ব ও নীতি নৈতিকতা থেকে কতটা বিচ্যুত।

এরকম পরিস্থিতিতে মানুষ কখনও কখনো হালকা ও চটুল ভাষায় কথা বলে। ওই শ্রেণির মানুষদের কাজ নিয়ে তারা মজা করে। এবং সেটা তারা করে ভিন্ন ভাষায়, বিশেষ করে হিন্দি কিংবা উর্দুতে। অডিও টেপে প্রধামনন্ত্রীকেও বলতে শোনা যায় (সাংবাদিকদের) থোরাসা হাদিয়া দে দো।’ কথাটি বলার পর তার অর্থপূর্ণ হাসিও পরিষ্কার শোনা যায়।

শেখ হাসিনা এখানে এক বর্ন মিথ্যা বা ভুল বলেন নাই। তিনি তার জীবন থেকেই দেখেছেন, সাংবাদিকদের মূল্য কত হতে পারে। সাধারণ মানুষও কম বেশি সেটা জানে। সমাজে আজ সাংবাদিকদের কতটা সম্মান মর্যাদা ও দাম আছে, সেটা তাদের প্রতিবেশিদের কাছ থেকেই জেনে নিতে পারেন। একটা কথা বলে রাখি, এখানে ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, কিন্তু সেটা কখনও উদাহরণ হতে পারে না।

লন্ডনে এক ব্যক্তির সঙ্গে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিচয় হয়েছিল। পেশায় তিনি একজন চিকিৎসক। আমি সাংবাদিক শোনার পর তিনি তার একটি অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলেন। বললেন এক বছর আগে তিনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ঢাকার প্রেস ক্লাবে চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত একটি সেমিনারেও তিনি বক্তব্য রাখেন।

সেমিনারের পর দুজন টিভি সাংবাদিক তার ছোট সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তিনি যখন প্রেস ক্লাব থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ওই দুজন সাংবাদিক তাকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে দেখেন যে তারা তার পেছনে পেছনে হাঁটতে হাঁটতে হাইকোর্টের গেট পর্যন্ত চলে গেছেন। তিনি বুঝতে পারেন যে তারা তাকে কিছু একটা বলতে চান।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওই লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসক সাংবাদিকদের কাছে জানতে চাইলেন কেন তারা তার পিছু পিছু যাচ্ছেন। সাংবাদিক দুজন তখন তার কাছে পাঁচশ টাকা চান। কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, সাক্ষাৎকার প্রচার করতে হলে এই টাকা তাদের দিতে হবে। তিনি তাদের বলেন, আমার সাক্ষাৎকার তোমাদের প্রচার করতে হবে না।

তারপরেও সাংবাদিক দুজন পিছু না ছাড়লে তিনি দুশো করে চারশ টাকা দিয়ে তাদের কাছ থেকে মুক্তি পান। আমি বুঝতে পারি, এই গল্পটি বলার পর তিনি আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছিলেন। আমিও সেটা অনুভব করতে পেরে আলাপচারিতা সংক্ষিপ্ত করে তার সামনে থেকে পালিয়ে যাই।