অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত, সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ্য, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ—এমন এক প্রেক্ষাপটে তার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে।
\r\nবিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ড. ইউনূস অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারে ভারসাম্য রক্ষা ও ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন বলে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ অনেকেই মনে করছেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে আলোচিত এক দরবারে জেনারেল ওয়াকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে নির্বাচন চাই এবং তা অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন হতে হবে।
\r\nপ্রফেসর ইউনূস শুরু থেকেই নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে দ্ব্যর্থতা দেখিয়ে এসেছেন। একবার বলেছেন ডিসেম্বর, আবার বলেছেন জুন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তার উপদেষ্টাদের বক্তব্যেও একরকম অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা গেছে। ফলত, রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিশেষ করে সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
\r\nজেনারেল ওয়াকার এই ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। দেশের সর্বস্তরের সেনা সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে সেনাবাহিনী তার দায়িত্ব থেকে পেছাতে পারবে না। এই বার্তা স্পষ্ট—সামরিক বাহিনী আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বরদাশত করবে না।
\r\nরাখাইন ইস্যুতে ড. ইউনূসের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে। করিডোর নীতিগতভাবে অনুমোদনের পরও তিনি তা রাজনৈতিকভাবে পরিষ্কার করেননি। জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে করিডোরের যৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করলেও, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা করেননি। সেনাবাহিনী এই সিদ্ধান্তকে “জাতির জন্য আত্মঘাতী” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছে— “কোনো করিডোর নয়”।
\r\n৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘মবতন্ত্রের’ নামে সৃষ্ট সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সেনাপ্রধান একে নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার করে বলেছেন, “এখন থেকে এসব আর সহ্য করা হবে না।” আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশের অনুপস্থিতিতে আরও ভেঙে পড়েছিল।
\r\nচট্টগ্রাম বন্দরের মালিকানা বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও সেনাপ্রধান প্রকাশ্য সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র একটি নির্বাচিত সরকারই নিতে পারে।” এই ইস্যুতে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠেছে।
\r\nসরকারঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল এনসিপি দাবি তুলেছে অন্তত তিনজন উপদেষ্টাকে এখনই সরিয়ে দিতে হবে— ড. সালেহউদ্দিন, ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং ড. আসিফ নজরুল। এদের বিএনপি-ঘনিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করছে তারা। অন্যদিকে বিএনপিও বলছে, সরকারের ভেতরে থাকা এনসিপি-ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকেও অপসারণ করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সর্বত্র।
\r\nবর্তমান প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক ইউনূসের সামনে দুটি পথ খোলা— হয় পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে অস্থিরতা প্রশমনের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন নিশ্চিত করবেন, নয়তো তিনি পদত্যাগ করে নিজেকে এই সংকট থেকে সরিয়ে নেবেন।
\r\nরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বল এখন ইউনূসের কোর্টে নেই। নেতৃত্ব এখন সেনাপ্রধান ও জনগণের প্রত্যাশার উপর নির্ভরশীল। ইউনূস যদি পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে পুনরায় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
\r\nবিএনপি ইতোমধ্যেই পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা না হলে সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তারা এই অন্তর্বর্তী সরকারকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ বলে অভিহিত করছে।
\r\n\r\n
উপসংহার: রাজনৈতিক সংকটের এই সন্ধিক্ষণে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সঠিক সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের উপর। সেনাবাহিনী ও জনগণের চাপের মুখে অধ্যাপক ইউনূস কোন পথে হাঁটবেন, সেটিই এখন জাতীয় রাজনীতির মূল প্রশ্ন।
\r\nহয় এখনই পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হওয়া, নয়তো ফের অস্থিরতা— এমনই সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।







