এএফএম সোলায়মান চৌধুরী বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন অবসরপ্রাপ্ত খ্যাতিমান কর্মকর্তা। যার সততা নিষ্ঠা ও সাহসিকতার গল্প অনেকটা কিংবদন্তিতুল্য। অতি সাধারণ বেশভূষা ও চলাফেরার জন্য তিনি খুব সহজে মানুষের সাথে মিশতে পারেন। একজন পিওন, ড্রাইভারকেও তিনি অনায়াসে হাসিমুখে ‘আব্বাজন’ সম্বোধন করতে পারেন। পেশাগত জীবনে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১৯ টি পদে দায়িত্ব পালন করেও তাঁর জীবন ধারণ, চলাফেরায় কোন প্রাচুর্য দেখা যায়না, অহংবোধ কী জিনিস সেটাও নেই তাঁর মধ্যে। তাঁর এই সাধারণ জীবন যাত্রার কারণে তাঁকে অনেকে ভুল বুঝে, অবমূল্যায়ন করে এমনকি তাঁর সাথে কাউকে কাউকে আমি বহুবার অসৌজন্যমূলক আচরণ করতেও দেখেছি। তিনি যে এসব বিষয়ে কষ্ট পাননা তা নয়, কখনও কখনও তাঁকে তীব্র অভিমান ও রাগ করতে দেখেছি। এত সহজ সরল সাধারণ চরিত্রের মানুষটা সেই রাগ ও অভিমান থেকে মাঝে মাঝে এমন জেদী আচরণ করেন যে, তখন আর কেউ তাঁকে বাগে আনতে পারেননা। কোন একটা পদে বা দায়িত্বে তাই তাঁর বেশী থাকা হয়না। জীবনে তিনি যত পদ অলংকৃত করেছেন তার মধ্যে এবি পার্টির আহ্বায়ক পদটাই সম্ভবত: সর্বোচ্চ সময়ব্যাপী থাকা পদ।
আমরা যখন জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গঠন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমন্বয় কমিটি করছিলাম তখন চট্টগ্রামের একটি অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তখনও ‘জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ রাজনৈতিক দল হয়ে উঠেনি। সেটা ছিল কেবলই একটি ‘উদ্যোগ’। তাই যে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আমাদের অনুষ্ঠানে আসতে পারতেন। আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতাম। কিন্তু আমাদের সেই অনুষ্ঠানে সোলায়মান চৌধুরীর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে তিনি মারাত্মক জিজ্ঞাসাবাদ ও জেরার মুখে পড়েন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অপমানবোধ ও জেদ থেকে তিনি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে সর্বাত্মকভাবে তিনি জনআকাঙ্ক্ষার কার্যক্রমে আত্মনিয়োগ করেন। বহুদিন এমন গেছে তিনি কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে জনআকাঙ্ক্ষার অফিসের ফ্লোরে ঘুমিয়েছেন। নিজের আর্থিক সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ঢেলে দিয়েছেন দলের জন্য। লোন করে নতুন গাড়ীও কিনেছেন যা সাংগঠনিক কাজের জন্য ছিল অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। জনআকাঙ্ক্ষায় তখন আরেকজন সিনিয়র ব্যক্তিত্ব যুক্ত ছিলেন তিনি হলেন জিয়া পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জনাব জাহাঙ্গীর চৌধুরী। জনআকাঙ্ক্ষা থেকে যখন আমরা নতুন রাজনৈতিক দল ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)’তে রূপান্তরিত হই, তখন গণতান্ত্রিক পন্থায় সকলের পরামর্শে এএফএম সোলায়মান চৌধুরীকে আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। গণতান্ত্রিক এই প্রক্রিয়ায় জনাব জাহাঙ্গীর চৌধুরী কিছুটা রুষ্ট হন এবং তিনিসহ সোলায়মান চৌধুরীর প্রতি যে কয়েকজনের একটু অপছন্দনীয় মনোভাব পোষণ করতেন তাঁরা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন এবং এবি পার্টিতে আর কন্টিনিউ করেননি।
সোলায়মান চৌধুরীর নেতৃত্বে করোনাকালীন কঠিন সময়ে আমরা নতুন দলকে তিল তিল করে এগিয়ে নিই এবং দলের নিবন্ধনের জন্য অপরিসীম ত্যাগ ও পরিশ্রম করতে থাকি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফ্যাসিবাদী সরকার ও নির্বাচন কমিশন ষড়যন্ত্র করে আমাদের নিবন্ধন দেয়নি।
এবি পার্টির রাজনীতি সম্পর্কে অনেকের প্রচুর কৌতুহল। নানা ভুল ধারণা নিয়ে অনেকে আমাদের দলে যুক্ত হতে আসেন। আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করি সঠিক কনসেপ্ট তুলে ধরতে। প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক হওয়া সত্বেও দলের সমাবেশগুলোতে শ্রদ্ধেয় সোলায়মান চৌধুরী অকপটে বলতেন, এবি পার্টির রাজনীতি বুঝতে তাঁর নিজেরও ৬ মাসের বেশি সময় লেগেছে। স্যারের অকপট স্বীকারোক্তি ও সরলতার জন্য তিনি বহু সমস্যা ফেইস করতেন। ফেসবুক ও হোয়াটস্অ্যাপে তিনি প্রায়ই নানারকম ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হতেন। বহুজনের কাছে তাঁকে দেখতাম বিকাশে টাকা পাঠাতে হতো। আমি আকারে ইংগিতে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম কিন্তু তিনি বুঝতেননা। এসব নিয়ে আমি খুব শংকিত ছিলাম কখন জানি তাঁর পাবলিকলি সম্মানহানি হয়!
তাঁর সাথে আমার সম্পর্কটা অম্ল-মধুর ব্যঞ্জনে আবদ্ধ ছিল। কতবার যে আমরা উনার রাগ ও মান-অভিমান ভাঙ্গিয়েছি তার হিসাব নেই। রাজনৈতিক কালচার দিয়ে তাঁকে ডিল করা যেতোনা। পিতৃত্ব ও বন্ধুত্বসূলভ আচরণ দিয়েই তাঁকে মেইনটেইন করতে হতো। দলের অনেকেই আমার এ মনোভাবের বিরুদ্ধে ছিলো। তারা আমাকে অভিযুক্ত করে বলতেন আমি অপেশাদার ও অরাজনৈতিক পলিসি নিয়ে উনাকে ডিল করছি; এটা মোটেও সাসটেইনেবল না। আমি জানতাম তাদের কথাই সত্য, এও বুঝতাম উনাকে এরকম ছাড়া অন্যভাবে ধরে রাখা সম্ভব না। উনি নিজে নীতির প্রশ্নে কঠোর এবং স্ট্রিক্ট কিন্তু তাঁকে কঠোরতা দিয়ে চালানো সম্ভব না। তিনি নিয়ম তৈরী করেন, নিয়মের জন্য আপোষহীন, কিন্তু তাকে নিয়মের বন্ধনে আবদ্ধ করা অসম্ভব। ভালোবাসা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে এ ধরনের লোকদের ধরে রাখা যায়না। দল যত বড় হচ্ছে, নানা মাত্রার ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন এরাইজ করছে, ততই আমি অনুধাবন করছিলাম স্যারের সাথে কারও কারও সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ছে। তিনিও এসব নিয়ে মান-অভিমান পর্বে জড়িয়ে পড়তেন। আমি বোঝাতাম, রাগ ভাঙ্গাতাম। একবার তো রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরম ব্যত্যয় ঘটিয়ে কার্যনির্বাহী কমিটির আমরা সকলেই সম্মিলিতভাবে দাঁড়িয়ে কানে ধরে তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েছি। আমার এসব ছেলেমানুষী পদক্ষেপ দেখে কেউ কেউ খুব অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আমি মনেকরি রাজনীতি মানেই হলো হিউম্যান ম্যানেজমেন্ট; এর কোন নির্দিষ্ট প্রফেশনাল গাইডলাইন নেই।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের চরম সংকটময় সময়ে সোলায়মান চৌধুরীর দলীয় কার্যক্রমে অনুপস্থিতি নিয়ে দলে খুব নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। দলের আহত, গুলিবিদ্ধ, গ্রেফতার হওয়া এবং পুলিশী হয়রানীতে বাসা-বাড়ি ছেড়ে যাযাবর জীবনে পতিত নেতাকর্মীদের তিনি খোঁজ খবর রাখতে পারেননি। তিনি সম্ভবত: অসুস্থ ছিলেন এবং নিজের গ্রামের বাড়িতে আটকা পড়েছিলেন। অভ্যুত্থানের পর তিনি আবার সক্রিয় হন, এমনকি প্রিয়তমা স্ত্রী’র মৃত্যু সত্বেও পরদিন প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাতের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। দলের কোন কোন নেতাকর্মী এটাকে ‘সেকরিফাইস’ হিসেবে না দেখে বাঁকা চোখে সমলোচনার দৃষ্টিতে দেখেছে; যা তাঁকে ব্যথিত করেছে। দলের আইনজীবীদের একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে একজন সিনিয়র নেতা সবার সামনে অসৌজন্যমূলকভাবে মঞ্চ থেকে উঠে যাবার জন্য বলায় তিনি খুবই মর্মাহত হন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট নেতারাসহ সকলে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও তিনি এই বেদনা ভুলতে পারেননি বা ক্ষমা করতে পারেননি।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে প্রস্তাব পাওয়ার কারণে তিনি দলীয় আহ্বায়ক পদ থেকে আকস্মিক পদত্যাগ করার বিষয়টি ফেসবুকে প্রকাশ করলে, এনিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় হয়। তিনি ভেবেছিলেন দল তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে ঝুলিয়ে রাখবে কিংবা তাঁর অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য চেষ্টা চালাবে। কিন্তু তিনি যেহেতু দলীয় বিধান লংঘন করে ফেসবুকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন এবং সে সংবাদ সব মিডিয়ায় প্রচার হয়ে গেছে তাই দলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম তাৎক্ষণিক তাঁর পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করে প্রফেসর ডা. আব্দুল ওহাব মিনারকে নতুন আহ্বায়ক নির্বাচন করে। এর পরদিন নাটকীয়ভাবে তিনি ঘোষণা দেন যে, তিনি দলে আছেন এবং আহ্বায়ক পদ ত্যাগ করেছেন দল থেকে নয়। তিনি মূলত: দলের আসন্ন কাউন্সিলে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার জন্যই পদত্যাগ করেছেন। এসব বিভ্রান্তিকর কথার কারণে দলের সিনিয়র পর্যায়ে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার মারাত্মক প্রভাব পড়ে দলের কাউন্সিলে। দলের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত না হওয়ায় তিনি খুবই হতাশ হয়ে পড়েন এবং নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। সকল কাউন্সিলরগণ তাঁকে যে উদার, নির্মোহ, গণতন্ত্রী ও পিতৃত্বসূলভ সম্মানের চোখে দেখতেন তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সোলায়মান চৌধুরী আর আমাদের সাথে কোনভাবেই সম্পর্কযুক্ত থাকবেন কিনা এ নিয়ে আমি চরম হতাশায় নিমজ্জিত হই। বলা যায় একেবারে হাল ছেড়ে দেওয়ার অবস্থা। তাঁর শুভানুধ্যায়ী ও স্বজনরা চাচ্ছিলেন তাঁকে রাষ্ট্রীয় কোন মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করা যায় কিনা সেজন্য যেন আমরা সিরিয়াস এফোর্ট দিই। আমরা এজন্য যথেষ্ট চেষ্টা চালাই। তাঁকে দুদক অথবা একটি সরকারী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করার বিকল্প প্রস্তাবে কিছুটা অগ্রগতি হয়। কিন্তু সরকারে থাকা তাঁর কয়েকজন ব্যাচমেটের আপত্তির কারণে তাঁকে দুদকের চেয়ারম্যান করার বিষয়টি চুড়ান্ত রূপ পায়নি। ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার প্রস্তাব জনাব সোলায়মান চৌধুরী নিজেই প্রত্যাখ্যান করেন। দলে তাঁর অপরিসীম অবদানের জন্য সকল ধরনের তিক্ততা সত্বেও আমরা চেয়েছিলাম তিনি অন্তত: দলের উপদেষ্টা হয়ে থাকুন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁকে প্রধান উপদেষ্টা ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য করা হোক। কিন্তু কার্যনির্বাহী কমিটি এ বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনেকরি দলের একজন নিখাদ প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও প্রথম আহ্বায়ক সোলায়মান চৌধুরীকে যেকোন মূল্যে আমাদের দলে কোন না কোন ফর্মে ধরে রাখা দরকার ছিল। কিন্তু আমার মনেকরা বা না মনেকরা দিয়েতো দলের সিদ্ধান্ত হয়না। দলের কার্যনির্বাহী পরিষদ এখন একটি নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বশীল বডি। দলে দিন দিন নানা মত পথের মানুষের সংযুক্তি ঘটছে। অতএব দল যত বড় হবে, গণতান্ত্রিক চর্চা যত বাড়বে, তত আমাদের মত প্রতিষ্ঠাতাদের প্রভাব ও একক চিন্তার কর্তৃত্ব কমতে থাকবে। জাহাঙ্গীর চৌধুরী যেমন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দলে সোলায়মান চৌধুরীর প্রাধান্য মানতে পারেননি, সোলায়মান চৌধুরীও মানতে পারেননি আমাদের কাউন্সিলরদের রায়। আগামীতে আমাকে ভোটে হারিয়ে কেউ যদি দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়! আমিও কি এই গণতান্ত্রিক চর্চা মানতে পারবো? সত্য কথা বলতে আমি নিজের উপরও আস্থাশীল নই। কথা ও কাজের মিল কোন মানুষই চুড়ান্তভাবে রাখতে পারেনা। যারা রাখতে পারে, তারা মানুষ না। তারা হলো মানুষরুপী অশরীরী আত্মা।
আমার পিতৃতুল্য শিক্ষক, নেতা, অভিভাবক ও বন্ধু এএফএম সোলায়মান চৌধুরী- আপনি সার্থক। আপনি এবি পার্টির মত একটি দলের জন্মকালীন পিতা। করোনার সময় আপনি সাহসী ও দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন আমরা যদি দল ঘোষণা করি তাহলে আমরা হয়তো থাকবোনা, কিন্তু দল থাকবে। সেদিন আপনি শক্ত না থাকলে আমরা হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারতামনা। আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর কোন ভাষা নেই। আপনার সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি। আপনি আপনার পুরোনো দলে ফিরেছেন। আশাকরি সেখানে আপনার যথার্থ মূল্যায়ন হবে। আমরা আপনার সর্বাঙ্গীণ সাফল্যের জন্য দোয়া করি। মহান আল্লাহ তায়ালা আপনার সহায় হোন।
লেখক, মজিবুর রহমান মঞ্জু
চেয়ারম্যান, এবি পার্টি





