পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ওপর প্রবাসী ও কারাবন্দি ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ ইসির কাঁধে নতুন চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কমিশন যদিও বিষয়টিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি “মহাযজ্ঞ” বলে বর্ণনা করছে, তবে বিশেষজ্ঞরা একে একটি “উচ্চাকাঙ্ক্ষী” ও “জটিল” প্রকল্প হিসেবে দেখছেন।


ইসি জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশিকে ভোটে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে তারা। এদের অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) রয়েছে, যা প্রবাসীদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের প্রধান শর্ত। অনলাইন নিবন্ধনের জন্য একটি ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ (পোস্টাল ভোট বিডি) চালু করা হচ্ছে, যেখানে প্রবাসীরা এনআইডি, পাসপোর্ট, সেলফি এবং ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিজে নিজেই রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন।


ইসির ধারণা, ৪০টি দেশে অবস্থানরত ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি প্রবাসীর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশের এনআইডি আছে এবং সেখান থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোটারের সাড়া পাওয়া যেতে পারে।



প্রাথমিকভাবে অনলাইন ভোটিং ও প্রক্সি ভোটিংয়ের চিন্তা থাকলেও বাস্তবতা বিবেচনায় ইসি শেষ পর্যন্ত পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাকেই গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচনের আগেই প্রবাসীদের নিবন্ধন সম্পন্ন করে, দলীয় প্রতীকের ব্যালট তাদের ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠানো হবে। ভোটাররা নির্ধারিত প্রার্থীর প্রতীকে চিহ্ন দিয়ে তা ফেরত পাঠাবেন। নির্বাচনের দিন সংশ্লিষ্ট আসনে এসব ব্যালট গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।



প্রবাসীদের মতোই কারাবন্দি ও নির্বাচন দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ব্যালট’ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের গোপনীয়তা নিশ্চিত করেই ব্যালট সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছে ইসি।



বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ প্রযুক্তিগত, আইনি ও বাস্তবায়ন-সংশ্লিষ্ট বহু জটিলতায় ভরা। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সময়মতো ব্যালট পাঠানো ও ফেরত আনা এবং ভোট গোপনীয়তা বজায় রাখা। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন আইন, প্রবাসীদের ডিজিটাল সাক্ষরতার সীমাবদ্ধতা এবং দূতাবাসগুলোর সীমিত জনবলও বড় বাধা।


নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, “এটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ, কিন্তু বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রবাসী ভোটে সাধারণত অংশগ্রহণের হার কম থাকে, আর বাংলাদেশ প্রথমবার বড় পরিসরে এটি করতে যাচ্ছে।”


তিনি আরও বলেন, “বিদেশে থাকা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভোট নিয়ে বিবাদ শুরু হলে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”


প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ সফল করতে কমিশন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, “এটা নতুন কাজ। আমরা একসঙ্গে অনেক কিছু হাতে নিয়েছি। সবার সহযোগিতা পেলে সফল হব।”


নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “ভোট গোপন রাখা, সময়মতো পৌঁছানো এবং কারও দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া—এই তিনটি বিষয়ই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”



প্রতিটি ভোটারের জন্য আনুমানিক ৭০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪০০ কোটি টাকার বেশি। ইসি জানিয়েছে, ভোট গ্রহণের আগেই প্রবাসী ভোটারদের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হবে। আগামী নভেম্বরে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ উদ্বোধন করা হবে এবং ১০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।


ইসির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১০টি দেশ থেকে প্রায় ৫৫ হাজার আবেদন এসেছে। এর মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি আবেদনকারী ইতোমধ্যে বায়োমেট্রিক (দশ আঙুলের ছাপ) দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে ১০টি দেশের ১৭টি দূতাবাসে ভোটার নিবন্ধনের কার্যক্রম চলছে, আরও কয়েকটি দেশকে যুক্ত করার কাজ চলছে।



প্রবাসী ও কারাবন্দি ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করার এই উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ সফল হলে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। তবে তা বাস্তবায়নে আইনি কাঠামো, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং সর্বোপরি জনগণের আস্থা অর্জন—সবগুলো ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনকে পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।