১৯৪৭ এ দেশভাগের পর কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-সিপিআই থেকে ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অব পাকিস্তান-সিপিপি প্রতিষ্ঠা পায়। তাদের কর্মসূচি হয়' রনদীপ কর্মসূচি '। তারা পাকিস্তানে অলরাইটার্স এসোসিয়ন খোলে। রেলওয়ে শ্রমিকদের দিয়ে বিপ্লবের নামে দেশব্যাপী চরম বিশৃঙ্খলা করে।

১৯৪৯ সালে পাকিস্তানে অলরাইটার্স এসোসিয়েশন সম্মেলন করে এবং তারা পাকিস্তান সরকারের নিন্দা করে। রাজশাহীসহ কয়েকটি অঞ্চলে বিদ্রোহ করে বাম কর্মীরা। ফলাফলে উত্তারঞ্চলে প্রায় দেড়শ বাম নেতা কর্মী গ্রেফতার হয়। অলরাইটার্স এসোসিয়নের নেতারা 'রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র ' মামলায় গ্রেফতার হন। বামদের কার্যক্রম চুপ হয়ে যায় একরকম।

সেসময় ভারতে সিপিআই রনদীপ কর্মসূচি ত্যাগ করে। এবং  সব গণতান্ত্রিক দলগুলোর সমঝোতায় সিদ্ধান্ত নেয় , বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী ও সামন্ততান্ত্রিক  সরকারের পরিবর্তে তারা গণতান্ত্রিক সরকার চায়। সিপিপি যথারীতি ভারতের সিপিআইকে অনুসরণ করে। কিন্তু  সিপিপি দেখে, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ধর্মের আদর্শে প্রভাবিত। বামদের কর্মসূচি তারা গ্রহণ বা সমর্থন করছে না। তারা তখন কৌশল অবলম্বন করে। 

প্রথমত, জনপ্রিয় দলগুলোতে প্রবেশ করে দ্বিতীয়ত, তাদের ধর্ম নিরপেক্ষ ,সমাজতন্ত্র মতাদর্শ ঢুকিয়ে দেয় এসময় বাম কমিউনিকেশন ব্যুরো আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রশংসা করলে, বামদের অনেক নেতা কর্মী ভাসানীকে সামনে রেখে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেয়, কারণ ভাসানীকে তারা সম্ভাবনাময় মনে করেছিলো, তারা তাঁকে \"ট্রোজান হর্স\" হিসেবে ধরেছিলো। বাকিরা হাজী দানেশের নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক  দল গঠন করে। এই ঘটনা ১৯৫২ সালের।

এর আগে ১৯৫০ সালে বামরা যুবদল গঠন করে। এটি বামদের প্রথম অঙ্গ সংগঠন। এই দলের প্রধান কাজ হয়, পাকিস্তান সরকারের সব ইসলামিক অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করা। বিপরীতে নববর্ষ , রবীন্দ্রনাথ , সুকান্ত কবিদের জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করা। অর্থাৎ ধর্মের বাইরে অনুষ্ঠান বানানো, যেখানে লোক সমাগম হয়।

১৯৫৩ সালে বামদের প্রেসারেই আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে 'মুসলিম' শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছে। ১৯৫৪ সালে বামরা নিষিদ্ধ হলেও, তাদের সবচেয়ে সংকট হয় সোভিয়েত ভেঙে গেলে।  তখন বামেরাও মাও, লেলিনসহ নানা ভাগে  ভাগ হয়ে যায়। তাদের কার্যক্রম ভাগ হয়, শক্তি ভাগ হয়। ফলে ৬৫ সালে মুজিব ৬ দফা দিয়ে আন্দোলনের কেন্দ্রে চলে আসে। তবে কোন সন্দেহ নাই, ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া দেশ ৭১ এ  ধর্মনিরেপক্ষ হওয়ার পেছনের বামদের ভুমিকা সবচেয়ে বেশি। 

তালুকদার মনিরুজ্জামানের বই \"বামপন্থী রাজনীতি ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়\" থেকে কয়েকটি বিষয় পয়েন্ট আউট করলে দাড়ায়  

১. বামেরা সব সময় বিপ্লব করতে চায়। প্রধান পছন্দ বিপ্লবী কর্মকান্ড।

২. এখানে তাদের রাজনীতি হল ইসলাম ধর্ম বিরোধী। (কারণ অন্যান্য ধর্ম নিয়ে তাদের বিরোধীতা দেখা যায় না।প্রধান ধর্ম মাওবাদ বা লেলিনবাদ)

-যে ভাসানীকে তারা ব্যবহার করলো সে ভাসনীকেরতারা ৭০ সালে ত্যাগ করলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র চাইবার কারণে

-ইসলামিক লোক, আদর্শ সরানো তাদের প্রধান রাজনীতি। তাতে জনগণ তাদের বিপক্ষে গেলেও। 

এই ব্যাপারটা এদিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ যে এ কারণেও হয়তো  বামরা এত পুরাতন রাজনৈতিক দল  হলেও , জনগনের দল তারা এজন্য হতে পারছে না।

 ৩. তাদের মাও বা লেলিন আদর্শ টিকিয়ে রাখার জন্য তারা  বড় অপরাধ, এমনকি স্বৈরশাসক কেও সমর্থন করে।

যেমন তারা অনেক বিপ্লবী হওয়া স্বত্বেও , ৬ দফা আন্দোলন থেকে দূরে থেকেছিল।এমনকি  ৭০ এর আন্দোলনেও তারা ইয়াহিয়াকে সমর্থন দিয়েছে! (মস্কোপন্থী ছাড়া) কারণ তারা মনে করেছে, ইয়াহিয়া চীন ঘেষা। এতে তাদের মাওবাদী আদর্শ প্রচারে কাজে দিবে। এখনকার শাহবাগ ও জুডিশিয়াল কিলিং-এ বামদের অবস্থানেও এর জবাব মিলবে।

বামদের শক্তিঃ লেখালেখি, পত্রিকা, সাহিত্য, সৃজনশীল কর্মসূচি। 

বামদের দুর্বলতাঃ বিভাজন, আদর্শ সম্পর্কে দ্বিধা , জনগণের বিশ্বাস-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব না দেয়া এবং জনতার কাছে গ্রহনযোগ্যতা না থাকা।

লেখক: ইসরাত জাহান মুর্শিদা, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান