মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর পরই একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়া মীর কাসেম আলীর মেয়ে সুমাইয়া রাবেয়া ফেসবুকে এক আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন,। যেখানে তিনি সেই সময়ে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করে মন্তব্য করেছেন, \"হাসিনার একবার ফাঁসি কার্যকরে মনের যন্ত্রণা মিটবে না।\"
তার ফেসবুকের স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হল:
অব্বুর রায় ঘোষণার দিন। আমি তখন সদ্য conceive করেছি, প্রথম সন্তান, জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা। সেই সময় অব্বুর বাড়ি আর শ্বশুরবাড়িতে পুলিশের রেইড। ভাইয়েরা পালিয়ে পালিয়ে দূরে কোথাও লুকিয়ে আছে। এত অস্থিরতার মাঝেও আমার conceive করার খবরটা ছিল আমাদের ঘরে একমাত্র আলোর ঝলক।
অব্বুও সেই ভয়াবহ সময়ে আরমান ভাইয়াকে নিয়ে আমার জন্য দোয়া করেছিলেন। আরমান ভাইয়া, যেহেতু অব্বুর ল’য়ার, তাই স্বাভাবিক ভিজিটেশনের বাইরে গিয়েও দেখা করতে পারতেন। এদিকে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছিল। চারদিকে সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছিল; মীর কাসেম তো সরাসরি রাজনৈতিক ব্যক্তি নন। আর ’৭১ সালে তার বয়স ছিল মাত্র ১৯। তাকে চট্টগ্রামের “মাস্টারমাইন্ড” বলা, সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে সব বাহিনী তার অধীনে চলত—এসবই ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
যাই হোক… মনে মনে ভাবছিলাম, ফাসি হবে না ইনশাআল্লাহ। আজীবন হলেও অন্তত অব্বুকে দেখতে পাবো, তার দোয়া পাবো। কিন্তু আমাদের সেই সামান্য আশাটুকু পর্যন্ত মুছে গেল ফাসির রায়ে।
অব্বু বের হয়ে বিজয়ের চিহ্ন দেখালেন—Victory sign। কিন্তু আমি তখন pregnant অবস্থায় অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর হরমোনের কারণে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। মনে হয়েছিল দুনিয়াটা এক মুহূর্তে উলটে গেল। এরপর তাকে এসি বাস তো দূরের কথা, মুরির টিনের মতো সংকীর্ণ ভ্যানে গাদাগাদি করে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। সরাসরি কনডেম্নড সেলে ঢোকানো হলো।
আরমান ভাইয়া জেলগেট থেকে নড়তেই পারছিলেন না। অব্বুকে ওই কনডেম্নড সেলে রেখে তিনি কীভাবে বাড়ি ফিরবেন? আমরা বারবার ফোন করে ফিরতে বলছিলাম, আর তিনি জেলগেটের সামনে দাড়িয়ে হাউমাউ করে কাদছিলেন। তার সেই কান্নার শব্দ দু’দিন ধরে আমার কানে বাজছিল। আর সেই অসহ্য কষ্ট আমি আর সহ্য করতে না পেরে… আমার বাবুটাকেও হারালাম।
আজ আবার হাসিনার রায় হলো। মানুষের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার রায়। তার অপরাধের সঙ্গে আজকের সিদ্ধান্ত দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কিন্তু এত কিছু ঘটার পরও তার জন্য কোনো কনডেম্নড সেল প্রস্তুত নেই। তিনি আরামে কোনো এসি রুমে বসে হাসছেন। তাকে কনডেম্নড সেলে না দেখা পর্যন্ত এই রায় আমার কাছে অপূর্ণ।
এত মানুষের কান্না… এত শোক… যে ফাসির আদেশ হয়েছে, একবার তা কার্যকর করেও এসব কষ্ট কখনোই পূরণ হবে না।





