গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
তিনি বলেন, এবারের গণভোট কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনা বা ঠেকানোর উদ্যোগ নয়। এটি রক্তের অক্ষরে লেখা জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন, যা দেশের সব মানুষের। জনগণের সম্মতির মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ে বিভাগীয় কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। সভার আয়োজন করে ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসন।
ঢাকা বিভাগের কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।
আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনায় একবাক্যে মত পাওয়া গেছে যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওপর কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই। এ বিষয়ে বাধার কথা যারা বলছেন, তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন অথবা ভিন্ন উদ্দেশ্যে বিষয়টি উত্থাপন করছেন।
তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছিল, তার বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন কিংবা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন—তারা আমাদের দুটি দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। এক, সেই স্বৈরতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ঠেকানো। দুই, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথনকশা তৈরি করা। দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ২৭ থেকে ৩৭ বছরের নিচে। আগামী অন্তত ৪০ বছর বাংলাদেশ কেমন হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আজকের প্রজন্মের।
তিনি আরও বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নন, তারা নাগরিকও। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের সেবায় সচেষ্ট থাকা এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেই দায়িত্বের অংশ হিসেবেই গণভোটে জনগণকে সচেতন করা ও ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ।
গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তির প্রসঙ্গ টেনে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ভোটব্যবস্থা নিয়ে অনাস্থার কারণে অনেকের কাছেই গণভোট নতুন অভিজ্ঞতা। তাই ব্যালটে কীভাবে ভোট দিতে হবে এবং ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের অর্থ কী—এগুলো স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যালটে থাকা ‘টিক চিহ্ন’কে প্রচারণার মূল প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়।
আলী রীয়াজ বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তিনটি ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করছে—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। সরকার নির্বাচন আয়োজন করে না, কেবল অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে; নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। একইভাবে বিচারও আদালত পরিচালনা করবে, সরকার বিচার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়তা করছে।
অতীতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সংবিধান সংশোধনের চর্চা আর চলতে দেওয়া যায় না। পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়নের সময় সংসদের কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত দিলেও প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে তা বাতিল করা হয়। সংবিধান সংশোধন যেন আর কখনো ‘ছেলেখেলা’ না হয়, সেটাই এই সংস্কারের লক্ষ্য।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মনির হায়দার বলেন, সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৪৮টি সুপারিশ চারটি ক্যাটাগরিতে গণভোটে আসছে। তবে মূল প্রশ্ন একটাই—আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে?
তিনি বলেন, গণভোট ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসতে পারে, যার ভয়াবহতা কল্পনার বাইরে। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল, গত ৫৪ বছরে তা অর্জিত হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থান সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন গণভোটের মাধ্যমে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
সভায় ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।





