ফেসবুকে দেখা একটি চাকরির বিজ্ঞাপন বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশি তরুণ মোহন মিয়াজির জীবন। বেশি বেতনের আশায় রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি আটকে পড়েন ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ ময়দানে। ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের প্রতিশ্রুতি পেলেও বাস্তবে তাকে ঠেলে দেওয়া হয় যুদ্ধের সম্মুখ সারিতে। সেখানে আহত হন তিনি, চোখের সামনে মারা যান আরেক বাংলাদেশি।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী মোহন জানান, ফেসবুকে একটি বিজ্ঞাপন দেখে তিনি রাশিয়ায় যান। সেখানে তার বর্তমান আয়ের পাঁচ গুণ বেশি বেতনের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। উন্নত জীবনের স্বপ্নে সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি তিনি।

প্রথমে পূর্ব রাশিয়ার স্ভোবোদনি এলাকায় ইলেকট্রনিক্সের কাজ দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু কয়েক মাস পর এক রুশ এজেন্ট আরও ভালো কাজের প্রস্তাব দিয়ে তাকে ও কয়েকজন বিদেশিকে নিয়ে যায় রোস্তভ-অন-ডনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে। সেখানে শুরু হয় সামরিক প্রশিক্ষণ।

মোহনের ভাষ্য, তাকে বলা হয়েছিল সামনের সারিতে পাঠানো হবে না। কিন্তু প্রশিক্ষণে শেখানো হয় অ্যাসল্ট রাইফেল চালানো, আরপিজি ও গ্রেনেড ব্যবহার। পরে দোনেৎস্কে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, প্রতারণার মাধ্যমে তাকে রুশ বাহিনীর একটি ব্যাটালিয়নে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এরপর তাকে পাঠানো হয় ইউক্রেনের আভদিভকা এলাকায়। সেখানে তার দায়িত্ব ছিল গোলাবারুদ ও জ্বালানি সরবরাহ, আহত ও নিহত সেনাদের দেহ উদ্ধার করা। যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা তুলে ধরে মোহন বলেন, পরিখা থেকে বের হলেই ড্রোন হামলা, গোলাবর্ষণ আর বিস্ফোরণের আতঙ্কে থাকতে হতো।

তিনি জানান, সামনের সারিতে যাওয়ার তৃতীয় দিনেই শ্র্যাপনেলের আঘাতে আহত হন। পরে তার সঙ্গে শুরু থেকেই থাকা আরেক বাংলাদেশি খনিবিস্ফোরণে নিহত হন।
মোহনের অভিযোগ, রুশ কমান্ডাররা তাদের বেতন আত্মসাৎ করতেন। প্রতিবাদ করলে মারধর ও নির্যাতন করা হতো। কখনো সংকীর্ণ বেসমেন্টে আটকে রাখা হতো, আবার অনেককে উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন চালানো হতো বলেও দাবি করেন তিনি।

তার দাবি, সেখানে নাইজেরিয়া, নেপাল, উগান্ডা, মিসর, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও যুদ্ধ করতে দেখা গেছে। এমনকি উত্তর কোরিয়ার সেনাদের সঙ্গেও তার দেখা হয়েছে।

দীর্ঘ আট মাস পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে ছুটির সুযোগে মস্কো গিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় অস্থায়ী ভ্রমণ দলিল সংগ্রহ করেন মোহন। পরে নানা জিজ্ঞাসাবাদ পেরিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি।

দেশে ফিরে মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মোহন। তিনি বলেন, পরিবার ভেবেছিল আর কখনো তাকে জীবিত ফিরে পাবে না।

এখন অন্য তরুণদের সতর্ক করছেন তিনি। তার ভাষায়, হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামে চাকরির প্রলোভন দেখানো কিছু প্রতিষ্ঠান আসলে মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ফাঁদ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল সেনা ক্ষয়ক্ষতির পর বিদেশি নাগরিকদের নানা প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে যুদ্ধে ব্যবহার করার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে।